বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন সংযোজন হবে। সংসদ হবে দ্বিকক্ষের; নতুন সংসদের প্রথম ১৮০ কার্যদিবস হবে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’—এই সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার; এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে গঠিত হবে ১০০ সদস্যের ‘উচ্চকক্ষ’ সংবিধানে জুলাই সনদ অন্তর্ভুক্ত হবে ,ডেপুটি স্পিকার হবেন বিরোধী দল থেকে এক ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী হবেন না ক্ষমতা বাড়বে রাষ্ট্রপতির
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ‘গণভোট’। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠেয় এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দেওয়ার জন্য নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সরকারের উপদেষ্টারাও দেশব্যাপী প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিনই প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদার) অধ্যাপক আলী রীয়াজও। কিন্তু, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে কী হবে, আর ‘না’ জয়ী হলে কী হবে- এনিয়ে সাধারণ ভোটারদের অনেকেরই এখনও স্পষ্ট ধারণা নেই।
গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে মোটাদাগে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে ভোটে নির্বাচিত নতুন রাজনৈতিক সরকারকে। আর ‘না’ জিতলে সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত এইসব সংস্কারে আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না নতুন সরকারের; এমনকি, পুরো জুলাই সনদ বাস্তবায়নেও নতুন সরকার বাধ্য থাকবে না।
‘হ্যাঁ’ জিতলে কী হবে? মোটাদাগে যেসব সংস্কার করতে হবে সেগুলো হলো- আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষের। নতুন সংসদের প্রথম ১৮০ কার্যদিবস হবে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’; এই সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যনুপাতে (পিআর) গঠন হবে ১০০ সদস্যের ‘উচ্চকক্ষ’। সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন লাগবে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। এছাড়া, সংবিধানে জুলাই সনদ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে হবে বিরোধী দল থেকে। এক ব্যক্তি জীবনে ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। এছাড়া ক্ষমতা বাড়বে রাষ্ট্রপতির। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে।
উল্লেখ্য, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ীরা একইসঙ্গে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ও জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। প্রথম ১৮০ কার্যদিবস পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ বিলুপ্ত হবে, তখন সদস্যরা কেবল জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে থাকবেন। আর, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে, নারী সদস্য কীভাবে বৃদ্ধি পারে- এগুলোসহ অন্যান্য বিষয়ে জুলাই সনদে বিস্তারিত পথ বাতলে দেওয়া রয়েছে।
প্রশ্ন; ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটে মতামত
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একইদিনে পৃথক রঙিন ব্যালটে চারটি বিষয়ে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে ভোটাররা মতামত জানাবেন। গণভোটের ব্যালটের প্রশ্নটি এরকম: ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার-সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’
(ক). নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। (খ). আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। (গ). সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। (ঘ). জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
জুলাই সনদের ভাগ্য নিয়েই প্রশ্ন
গণভোটের ব্যালটে থাকা শেষ দুটি বিষয় ‘গ’ ও ‘ঘ’ পর্যালোচনা করলে যেটি দাঁড়ায় সেটি হলো- ‘না’ জিতলে কার্যত জুলাই সনদ বাস্তবায়নেই কোনো ধরনের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না নতুন নির্বাচিত সরকারের। কারণ শেষ দুটি বিষয়ে বলা হয়েছে- ‘....বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।.. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।’
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে কি আছে?
গতবছরের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এর গেজেট জারি হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুথানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে। এ গণঅভ্যুত্থানের ফলে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে তত্কালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে। চব্বিশের ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ৮ আগস্ট বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকারিতা ও স্বীকৃতি লাভ করে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে সুশাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করার উদ্দেশে অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং এই কমিশনসমূহ স্ব স্ব প্রতিবেদন সরকারের নিকট পেশ করে।
আদেশে বলা হয়, প্রতিবেদনগুলোতে অন্তর্ভুক্ত সুপারিশের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার গতবছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সংবিধান সংস্কারসহ অন্যান্য সংস্কারের সুপারিশ সম্বলিত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ প্রণয়ন করে এবং রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সম্মিলিতভাবে এ সনদে স্বাক্ষর ও তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে।
আদেশে আরো বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন এবং এ উদ্দেশ্যে গণভোট অনুষ্ঠান, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও পরিষদ কর্তৃক সংবিধান সংস্কার করার আবশ্যকতা রয়েছে। তাই জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা একান্ত প্রয়োজন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরামর্শক্রমে, রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করলেন।
আদেশের ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশে এই আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হইবে।’ আদেশের ৭-এ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং এর কার্যাবলি ও বিলুপ্তির কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘পরিষদ উহার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।’
আ. দৈ./কাশেম