আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন । আর এই নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে সংঘাত। প্রাণহানিও ঘটেছে। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাগবিতণ্ডা এখন রূপ নিচ্ছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক, আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে গত ৫ আগস্টের পর লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র।
গত বুধবার শেরপুর-৩ আসনে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম। এর আগে গত ২২ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জে ওয়াজ মাহফিল থেকে ফেরার পথে নিজ দলীয় কার্যালয়ের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন হযরতপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসান মোল্লা। একই দিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অপরাধীদের ধরতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান র্যাব-৭-এর ডিএডি মো. মোতালেব।
পরদিন ২৩ জানুয়ারি কক্সবাজারের রামুতে শফিউল আলম নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। যদিও এসব ঘটনার সবই নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দাবি।
শেরপুরের সহিংসতার ঘটনায় গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
একই সঙ্গে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ১৮টি ঘটনায় চারজন নিহত এবং ২৬৮ জন আহত হয়েছেন। চলতি জানুয়ারি মাসেও সেই ধারায় কোনো লাগাম টানা যায়নি। রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি জনপদে বাড়ছে ছিনতাই ও গুলির ঘটনা। গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুরের পল্লবীতে এক মুদি দোকানিকে গুলি করে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা জনমনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও কারাগার থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখন রাজনৈতিক মাঠ দখলে ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচ হাজার ৭৫০টি অস্ত্র লুট হলেও এখনো এক হাজার ৩৪২টি মারণাস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যার মধ্যে এসএমজি, অ্যাসল্ট রাইফেল এবং স্নাইপার রাইফেলের মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র রয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, এসব অস্ত্রের পাশাপাশি সীমান্ত পথে আসা ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। দেশের ২৭টি সীমান্তবর্তী জেলায় সক্রিয় প্রায় ৭০০ ‘লাইনম্যানের’ মাধ্যমে পিস্তল ও রিভলভার সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং পুরান ঢাকার এক সন্ত্রাসী হত্যাকাণ্ডে ‘৭.৬৫ ক্যালিবার’ বুলেটের ব্যবহার গোয়েন্দাদের ভাবিয়ে তুলেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘এত বড় নির্বাচনে সব জায়গায় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবে আমরা কর্মীদের উসকানিতে পা না দিতে বারবার বার্তা দিচ্ছি।’ অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সদস্য ইয়াসিন আরাফাত প্রশাসনের ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘সুষ্ঠু ভোটের জন্য প্রশাসনকে হামলা ও পোস্টার ছেঁড়ার মতো বিষয়ে কঠোর হতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিনই দেশের প্রধান দুটি দলের নেতাদের বক্তব্য সাধারণ মানুষকে হতাশ করেছে। তাঁদের বক্তব্যগুলো তৃণমূলে প্রভাবিত হয়। তাঁদের ধারণা, নির্বাচনী মাঠ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এ কারণে সংঘাতের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়।’ গুলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা এত দিন অস্ত্র মজুদ করে রাখলেও এখন তা বের করছে। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর ভরসা না করে প্রার্থীদেরও উচিত নিজ এলাকার অস্ত্রধারীদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করা।’
সারা দেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদর দপ্তরে ‘জয়েন্ট কোর্ডিনেশন সেল’ গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সব বাহিনীর সমন্বয়ে সারা দেশের নিরাপত্তা মনিটর করা হচ্ছে এবং টহল বাড়ানো হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির নির্বাচনী সহিংসতা ও উসকানিমূলক বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, লুণ্ঠিত এক হাজার ৩৪২টি মারণাস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান চালানো। সীমান্তবর্তী ‘লাইনম্যান’ ও অস্ত্র সরবরাহকারীদের তালিকা ধরে গ্রেপ্তার। প্রার্থীদের ক্যাডার বাহিনীর তালিকা প্রকাশে বাধ্য করা।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতি ছাড়া আগামী নির্বাচনকে সহিংসতামুক্ত রাখা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট (অব.) জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিই হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মূল শক্তি। যদি কারো বিরুদ্ধে কোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার বা কোনো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকার বিন্দুমাত্র শৈথিল্য প্রদর্শন করবে না। নির্বাচনে কাউকে আইন ভঙ্গ করতে দেওয়া যাবে না। বেআইনি কাজ করলে তাঁকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
আ. দৈ./কাশেম