আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি বলা হয়। এআই আধুনিক প্রযুক্তি জগতের এক বিস্ময়কর সংযোজন। শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—এআই কি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করবে? যদি করে, তবে আমাদের করণীয় ও কর্তব্য কী?
নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় জনগণের সঠিক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য। বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ে রাজনীতি, জনমত ও তথ্যপ্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে নির্বাচনের সময় এআই-এর ব্যবহার তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এআই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি তৈরির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ডিপফেক ভিডিও, কৃত্রিম অডিও, ভুয়া ছবি ও স্বয়ংক্রিয় বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে খুব সহজেই ভুল তথ্য ছড়ানো সম্ভব। কোনো প্রার্থীর বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার করা, মিথ্যা সমর্থন বা বিরোধিতা তৈরি করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম জনমত সৃষ্টি করা খুব সহজ । এর ফলে সাধারণ ভোটার বিভ্রান্ত হয় এবং ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণে করবে।
নির্বাচনের দিন সকালে হঠাৎ করে যদি কোনো প্রার্থীর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর একটি ভিডিও প্রকাশ পায়, তবে তা ভোটারদের আচরণে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। বাস্তবতা হলো, ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে এবং কম খরচে এমন ভুয়া ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যা যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই জনমনে ভুল বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় ও কর্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের যেকোনো রাজনৈতিক খবর বা তথ্য যাচাই না করে বিশ্বাস করা বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তথ্যের উৎস নির্ভরযোগ্য কি না, তা যাচাই করা জরুরি। সন্দেহজনক ভিডিও, অডিও বা খবর দেখলে তা যাচাইকারী সংস্থা বা গণমাধ্যমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত। দ্বিতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতন আচরণ অপরিহার্য। আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো পোস্ট শেয়ার না করে যুক্তিবোধ ও বিবেচনা প্রয়োগ করতে হবে।
রাষ্ট্র ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো এআই-ভিত্তিক অপব্যবহার শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন, নীতিমালা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের উচিত তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপন করা।
অতি দ্রুত এআই নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং এই ইন্ডাস্ট্রির বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে তা চূড়ান্ত করতে হবে। এআই-এর সঠিক ব্যবহার, অপব্যবহারজনিত শাস্তি এবং এর দায়িত্বশীল প্রয়োগের জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এআই নীতিমালা ও এর ব্যবহারিক প্রয়োগ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এআই বাংলাদেশের নির্বাচনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ভুয়া বা ডুপ্লিকেট ভোটার শনাক্তকরণ এবং ডেটা বিশ্লেষণে এআই নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
এআই ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কার্যকর হতে পারে। এআই-ভিত্তিক চ্যাটবট বা ডিজিটাল সহকারী ব্যবহার করে ভোটাররা সহজেই ভোটের তারিখ, কেন্দ্রের অবস্থান, ভোট দেওয়ার নিয়মসহ প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, নতুন ভোটার এবং প্রবাসী ভোটারদের জন্য এটি সহায়ক হতে পারে। প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভোটারদের জন্যও এআই নির্বাচনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, আসন্ন নির্বাচনে এআই আমাদের জন্য সম্ভাবনার চেয়ে বেশি সংকটই নিয়ে আসতে পারে। যদি আমরা সচেতন হই, যুক্তিবোধ প্রয়োগ করি এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আচরণ করি, তবে এআই-সৃষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যেও একটি স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রযুক্তির শক্তির চেয়েও মানুষের সচেতনতা ও নৈতিকতাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।
লেখক: প্রকৌশলী মো. তৌফিক রহমান