নানা অনিয়ম,দুর্নীতি,ক্ষতার অপব্যবহার,কথিত উন্নয়ন ও অবৈধভাবে বনানী কাঁচাবাজার মার্কেট ভবনের দেয়াল ঘেঁষে অস্থায়ী উল্লেখ ৪১টি দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দের নামে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা শওকত ওসমানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।ওই ভবনের ৩ দিকের দেয়াল ঘেঁষে এসব দোকান নির্মাণের কাজ চলছে।
অথচ মার্কেট ভবনের সৌন্দর্য, নিরাপত্তা, যানজট ও ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের মারাত্নক ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণ পেতেই এতোদিন ওই ভবনের ৩দিকে জায়গা খাঁলি রাখা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক কোটি টাকার লোভ সামলাতে না পেরে ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা শওকত ওসমানের সিন্ডিকেট প্রচলিত আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে একক ক্ষমতা বলে খালি জায়গায় দোকান বরাদ্দ দিচ্ছেন।
এমনকি রাজস্ব বিভাগের মার্কেট শাখার মতামত পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। তাদের মতামত ছাড়াই অবৈধভাবে দোকান বরাদ্দ সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন। ফলে অগ্নিকান্ডের মারাত্নক ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে ওই মার্কেট ভবনটি। এসব দেখার যেন সরকারের কেউ নেই।
এসব বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান ‘আজকের দৈনিক প্রত্রিকাকে’ বলেন, রাজধানীর বনানী কাঁচাবাজার ভবনের দেয়াল সংলগ্ন তিন পাশে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।আগের দোকানীদের কাছ থেকে বকেয়া ভাড়া নিয়ে তাদেরকে বরারদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এবং বাজার সার্কেলের শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতামত ছাড়াই কেনো অবৈধভাবে এসব দোকান বরারদ্দ দেওয়া কারণ জানতে চাইলে, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসকের ইচ্ছায় দোকান বরারদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আর অস্থায়ীভাবে দোকান বরাদ্দের বিষয়ে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও বাজার সার্কেলের মতামতের প্রয়োজন হয় না।
আগের নির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদের পর ওইসময় অনেক চেষ্টা করেও অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে অবৈধ দোকান বরাদ্দ হয়নি কেনো ? এই প্রসঙ্গে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বলেন, তখন মেয়র চাননি। এখন প্রশাসক চাচ্ছেন তাই হচ্ছে। অবৈধ লেনদেনের বিষয়টি তিনি এরিয়ে যান তিনি।
এদিকে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে আজকের দৈনিক পত্রিকাকে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন,সাবেক মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের আমলে একটি চক্র প্রথমে বনানী কাঁচাবাজার মার্কেট ভবনের দেয়াল ঘেঁষে অস্থায়ীভাবে কিছু দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দ দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে ছিলো। পরে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তৎকালীন মেয়র মো.আতিকুল ইসলাম ওই স্থানে দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। কিন্তু সুযোগ সন্ধানী কতিপয় স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি নিজেকে বিএনপির নেতা পরিচয় দিয়ে প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা শওকত ওসমান, নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান, সম্পত্তি কর্মকর্তা মিলনগং কয়েকজন ব্যবসায়ীদেরকে দোকান দেয়ার নামে কয়েকটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।তারা কৌশলে পুরনো বকেয়া দোকান ভাড়া পরিশোধ দেখিয়ে নতুন করে আবেদন নিয়েছেন। অস্থায়ীভাবে প্রতিটি দোকান বরাদ্দ উল্লেখ করা হলেও ইটের গাথুনি দিয়ে পাকা দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। আর ওইসব দোকান বরাদ্দসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাবাদ নেওয়া হচ্ছে এক কোটি ২০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত করে।
৪১টি দোকন অস্থায়ী বরাদ্দের বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দপ্তর এবং বাজার সার্কেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত ছাড়াই প্রশাসকের ওই সিন্ডিকেট অত্যন্ত দাপটের সাথে দোকানগুলো বরাদ্দ দেওয়া, ইচ্ছা মাফিক মূল্য নির্ধারণ করা এবং নির্ধারিত মূল্যের বাইরে গোপন আতাতের মাধ্যমে অবৈধভাবে আরো কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মিশন বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের তোর আর জবাব দিহতিার কোন বালাই নেই।
সূত্র মতে, ওই মার্কেটের ভেতরের দোকানদার এবং আশপাশের সড়কের ব্যবসায়ীরা গণমাধ্যমকে জানান, কোনো ভবনের দেয়াল সংলগ্ন দোকান নির্মাণ হতে পারে না। ফুটপাত এবং দেয়ালের মাঝখানের খালি জায়গায় দোকান তৈরি করায় মার্কেটের অগ্নিঝুঁকি বাড়বে। একসময় কিছু অবৈধভাবে দোকান ছিল। পরে ওইসব অবৈধ দোকান পাট উচ্ছেদ করার পর মার্কেট, ফুটপাত ও আশপাশের পরিবেশ সুন্দর হয়েছে। কিন্তু এখন আবার নতুন করে অবৈধ দোকানগুলোকে টাকার বিনিময়ে বৈধতা দেওয়ার জন্য প্রশাসকের সিন্ডিকে এই উদ্যোগ নিয়েছেন। গত ১৭ আগস্ট ডিএনসিসি নতুন করে এসব দোকান বরাদ্দ করেছে।
আরো অভিযোগ উঠেছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকাখ্যাত বনানীর কাঁচাবাজারের দোকান বরাদ্দে আইন অমান্য করা হয়েছে। এই বিষয়ে ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে এই বরাদ্দ প্রস্তাব উঠেছিল। কারণ হিসাবে তারা বলছেন, বনানী কাঁচাবাজার মার্কেট ভবনের দেয়াল ঘেঁষে নির্মিত আগের দোকানগুলো পাশের ফুটপাত ও সড়ক দখল করত। এতে ওই এলাকায় মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হতো। ২০২২ সালে ডিএনসিসি জনস্বার্থ বিবেচনা করে সেসব দোকান উচ্ছেদ করা হয়। এরপর থেকে ওই মার্কেটের দু’পাশের সড়কের ফুটপাতে মানুষের চলাচল স্বাভাবিক ছিল। মার্কেটের আলো-বাতাস ও খোলা জায়গায় বের হওয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষ চলাচল করতে পারত।
জানা যায়, ২০১৬ সালের মার্চে ডিএনসিসির বনানী কাঁচাবাজারে আগুন লাগে। তখন মার্কেটের নিরাপত্তা বিবেচনায় দেয়াল ঘেঁষে অস্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া ৩৩টি দোকান বাতিল করে তৎকালীন ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। এরপরও ওইসব দোকানদাররা সেখানে ব্যবসা অব্যাহত রাখে। ২০১৭ সালে ওই দোকানদাররা দোকানের বকেয়া ভাড়া পরিশোধের আবেদন জানায়। পরে ডিএনসিসি ২০১৯ সালে বনানী কাঁচাবাজার মার্কেট ভবনের দেয়াল ঘেঁষে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নিলেও তা রহস্যজনক কারণে থেমে যায়। সর্বশেষ ২০২২ সালের জুলাই মাসে ওই দোকানগুলো উচ্ছেদ করে ডিএনসিসি।
২০১৬ সালে দোকান বাতিল করার পর থেকে ২০২২ সালে উচ্ছেদ করা পর্যন্ত বিনা ভাড়ায় দোকান পরিচালনা করায় সেসব বকেয়া পরিশোধ করে দোকান বরাদ্দ পেতে আবেদন করেন। তাদের এই ফাঁদে পা দেয় ডিএনসিসির অসাধু চক্রটি। তারা বরাদ্দ কমিটিকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ফাইল উপস্থাপন করে বরাদ্দ করেছে ব্যক্তিগত সুবিধা পেতে।
নিয়ম অনুযায়ী ১১ সদস্যবিশিষ্ট বরাদ্দ কমিটির কাছে প্রস্তাবটি উত্থাপন করার নিয়ম রয়েছে। ওই কমিটি বরাদ্দের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে-এমনটিই আইনে বলা হয়েছে। বরাদ্দ কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন-ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি বা পরিচালনা কমিটির সদস্য নারী ও পুরুষ, ডিএনসিসির সচিব, প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা, আইন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট এলাকার আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। এই বরাদ্দ কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। এছাড়াও আইন অনুযায়ী বরাদ্দ বাতিলের ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানা হিসাবে ১২ মাসের সমপরিমাণ টাকার পে-অর্ডার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর জমা দিয়ে পুনঃবরাদ্দের আবেদন করতে হয়। এক্ষেত্রে তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
আ. দৈ./কাশেম
।