ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর,সুবিধাভোগী,নানা অনিয়ম,দুর্নীতি এবং জনগণের পকেট হাতিয়ে নানা কৌশলে কয়েক কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া সিন্ডিকেট আরো শক্তিশালী হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ডিএনসিসির উপ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা,একাধিক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা,অঞ্চল-৫ এর নির্বাহী প্রকৌশলীসহ আরো বেশ কয়জন কর্মকর্তা।
তবে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ সাবেক মেয়র মো.আতিকুল ইসলাম শত শত কোটি টাকা লোপাটের পালিয়েও রক্ষা পাননি। বর্তমানে মো.আতিকুল ইসলাম কারাগারে আছেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট বর্তমানে আরো শক্তিশালী হয়েছেন। ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজকে সামনে রেখে অত্যন্ত দাপটের সাথে তারা কোটি কোটি টাকা লোপাট করে যাচ্ছেন। অথচ তাদের জবাব দিহিতার কোন বালাই নেই।
নাম না প্রকাশের শতে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে বার্ষিক বাজেটের সিংহভাগ অর্থ লোক দেখানো,কথিত উন্নয়ন, অপ্রয়োজনীয় নানা প্রকল্পের নামে ইচ্ছা মাফিক টাকা বরাদ্দ ও খরচ করা হচ্ছে। শুধু তাইনয় কয়েকশত কোটি টাকা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেক আসবাবপত্র কেনা কাটায় মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য হয়েছে।
এমনকি ডিএনসিসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরদীর্ঘদিনে সঞ্চিত তহবিল স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এবং কল্যাণ ফান্ডের টাকা ঠিকাদারদের অগ্রীম বিল পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাঝে প্রচন্ড ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে অঞ্চল-৫ এর কয়েকটি বড় বিল ঠিকাদারদের অগ্রীম পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন। এই ধরনের কার্যক্রম চলতে থাকলে আগামী ২/৩ মাস পরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন প্রদান করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
তারা জানান, এই সিন্ডিকেটকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সিনিয়র ও ফ্যাসিস্ট বিরোধী কর্মকর্তাদের কোনঠাসা করে রাখার মিশন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইতিপূর্বে রাজস্ব বিভাগের নানা অনিয়ম,পরিকল্পিতভাবে চাঁদাবাজী, দুর্নীতি,লোপাট যেন রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। নগরীর লক্ষ্যাধিক ব্যবসায়ীর পকেট থেকে নতুন ট্রেডলাইসেন্স ইস্যু ও পুরাতন ট্রেডলাইসেন্স নবায়নে নির্ধারিত প্রতিটি খাতের ফি,সরকারের ট্যাক্স এবং ভ্যাটের বাইরে অবৈধভাবে (বিবিধ খাত, বই উল্লেখ করে) আরো ৭০০ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে বই না দিয়ে কম্পিউটার প্রিন্টের এক পাতার রশিদকে বই বলা হচ্ছে,আর বিবিধ খাতের ৫০০ টাকা কোন খাত নেই। এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েরও কোন অনুমদোন নেই। এই টাকা কোন অ্যাকাউন্টে বা কার পকেটে যায়, তার কোন সঠিক জবাব নেই।
অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে নির্ধারিত ফি’এর বাইরে এই ৭০০ টাকা করে নেয়ার কোন নজির নেই। প্রতি বছর সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের আমল থেকে শুরু হওয়া এই লোপাট এখনো বহাল রয়েছে।
তারা আরো জানান,বর্তমান প্রশাসকের আমলে বসুন্ধরা আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাসহ আরো কিছুর নতুন এলাকায় হোল্ডিংট্যাক্স নির্ধারণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাণ্যিজ্যিক ভবনকে আবাসিক ভবনের ট্যাক্স নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবাসিক রেইটে ধরার নির্দেশনা দেওয়া হয়। আদালতে বিচারাধীন মামলা চলমান সত্বেও অবৈধ সুবিধা ও লেনদেনের বিনিময়ে অনেক কম ট্যাক্স নির্ধারণ করে আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বনানীতে বোরাক টাওয়ার (হোটেল শেরাটন) এবং গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালের কয়েক শত কোটি টাকার হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া রয়েছে। এই ধরনের আরো বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা বেশ আলোচনায় স্থান পাচ্ছে। এছাড়াও ডিএনসিসির বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত বরাদ্দ দেওয়া, বড় বড় বেশ কয়টি পুরনো মাকের্টে দোকান বরাদ্দের নামে অবৈধভাবে মোটা অংকের অর্থ আদায়। পুরানো মাকের্টকে পরিত্যক্ত ঘোষণার পর দোকান পাট চালু রেখে গোপনে উক্ত সিন্ডিকেট মোটা অংকের টাকা কালেকশন করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এসব কাজে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সহযোগিতায় রয়েছেন ডিএনসিসির উপ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রাপ্ত) মো. মহিউদ্দিন এবং সিন্ডিকেটর সদস্যরা । উপ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনসহ এই সিন্ডিকেটটি সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের নির্দেশনা এবং যাবতীয় অনিয়ম ও দুর্নীতিকে নিরবে সহযোগিতা করেছেন। তারা কখনো সরকারের প্রকাশিত গেজেটে উল্লেখিত আইন ও বিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে কোন মতামত দেননি। বর্তমান প্রশাসকের আমলেও তারা আগের অনিময়, দুর্নীতি এবং বেআইনী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কোন মতামত না দিয়ে নিজে লাভবান হচ্ছেন।
আরো অভিযোগ উঠেছে, আগামী ২২ জানুয়ারি তার চাকরির মেয়াদ শেষ হবার কথা রয়েছে। কিন্তু উপ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনকে প্রশাসনের কাধেঁর ওপর ভর করে আরো এক বছরের জন্য কথিত চুক্তি ভিত্তিক একই পদে বহাল রাখা চেষ্টা চলছে। কারণ তাকে রাখলে সিন্ডিকেট ফ্রিস্টাইলে সবধরনের কর্মকান্ড অব্যাহত রাখতে পারবেন।
এদিকে গত বছর ২৭ নভেম্বর প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকে চিঠি পাঠিয়ে ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার পূর্বক নানাবিধ অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ তথ্য সংগ্রহ করেছে। ডিএনসিসির পক্ষ থেকে দুদকের চিঠির আলোকে বেশ কিছু নথিপত্র সরবরাহ করার পর ওইসব নথিপত্র যাচাই বাছাই চলছে।
এরআগে গতবছর এপ্রিলে রাজধানীর গাবতলীর গবাদি পশুর হাট ইজারার দরপত্র বাতিলের ঘটনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দুদকের একটি দল ডিএনসিসি কার্যালয়ে অভিযান চালায়। ইজারা বাতিলকে ‘ত্রুটি’ হিসেবে চিহ্নিত করে এ সিদ্ধান্তে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরির কথা বলেছিল দুদক। গেল ৩০ এপ্রিল ডিএনসিসি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে দুদকের দল প্রশাসক ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে।
গাবতলী গরুর হাটের ইজারা দরপত্রে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি করার প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুদক জানতে পেরেছে,২০২৫ সালের হাট ইজারায় সর্বোচ্চ দর ছিল প্রায় ২২ কোটি টাকা, যা সরকার নির্ধারিত দরের (১৪.৬১ কোটি) চেয়ে অনেক বেশি। মূল্যায়ন কমিটি সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়ার সুপারিশ করলেও তা বাতিল করে ‘খাস আদায়’-এর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়—বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। তবে হাট ইজারা সরকারি ক্রয় নীতিমালার আওতায় পড়ে না এবং এ ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই—এমন বিশেষজ্ঞ মতামত পায় দুদক। দুদক বলেছিল, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দরপত্র বাতিলের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অভিযান পরিচালনাকারী দলটি পরবর্তী করণীয় জানতে চেয়ে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
এ ছাড়াও অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে ডিএনসিসির টেন্ডার বাণিজ্যসহ অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ ছাড়াও অবৈধভাবে দোকান বরাদ্দ, ফুটপাত বরাদ্দ, মার্কেট নির্মাণ, ই-রিকশা প্রভৃতি প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডেই অনিয়ম আর ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে এজাজের বিরুদ্ধে।
এর আগে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণে অর্থ নিয়ে দোকান বরাদ্দ না দেওয়ার অভিযোগ করেন। ওই ব্যবসায়ীদের দাবি, ‘প্রশাসকের আত্মীয় মাহবুবুর রহমান দোকান দেওয়ার কথা বলে প্রশাসকের নামে টাকা নিয়েছেন।’ তাদের বক্তব্য হলো, ‘প্রশাসকের আত্মীয় মাহবুবুর রহমান প্রশাসকের নাম ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের দোকান দেওয়ার নামে কয়েক দফায় ৫-৬ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন। কিন্তু এখনো দোকান দেওয়ার কোনো খবর নেই।
এসব বিষয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের সাথে কথা বলা জন্য তার মুঠোফোনে কল দিলে,তিনি কল কেটে দেন। এর আগে ডিএনসিসির সচিব আসাদুজ্জামানের সাথে কথা বলার জন্য মুঠোফোনে কল দিলে,তিনিও কল কেটে দেন। উপ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনের মুঠোফোনে কল দিলে তিনিও কল কেটে দেন। যারফলে তাদের বক্তব্য পাঠকদের জানানো গেলো না।
আ. দৈ./কাশেম