রাজধানীতে বাসা বাড়ি ও ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ কার্যকর করতে পারেনি রাজনৈতিক ও নির্বাচিত সরকার। কারণ বাড়ির মালিকরা সংঘবদ্ধ এবং প্রতিষ্ঠিত। আর ওইসব বাসা বাড়ির ভাড়াটিয়েরা ভাসমান, অস্থায়ী বসবাসকারী এবং সংঘটিত নয়। যারফলে বছরের শুরুতে ঢাকা শহরে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাড়িভাড়া। অথচ ভাড়া নির্ধারণে সরকারের পুরনো আইন রয়েছে কিন্তু কার্যকারি নেই। এই সুযোগে অসহায় ভাড়াটিয়েদের জিম্মি করে বাড়ির মালিকরা ইচ্ছে মতো বাসা ভাড়া বাড়ান এবং আদায় করেন। আপত্তি করলে বাসা ছাড়ার হুমকি আসে।
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ তার বিদায়কালে হুট করে সস্তায় বাহবা নিতে ১৯৯১ সালের বাড়ি ভাড়া আইনকে সামনে এনে সংবাদ সম্মেলনে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের অধিকার সুরক্ষা নামে কিছু নির্দেশনা জারি করেছেন। যা হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই না। কারণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজের এক বছর মেয়াদের চুক্তি শেষ হবে। আবার নতুন করে মেয়াদ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে আলোচনা আসার জন্য তিনি এই নির্দেশনা জারি করেছেন। যা হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই না। গত এক বছরে তিনি অনেক বির্তকিত কাজ করেছেন। একাধিকবার দুদক অভিযান চালানোর পরও তার প্রশাসনের অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। বর্তমানে ডিএনসিসির প্রশাসকের ভয়াবহ দুর্নীতি ও কোটি কোটি টাকার লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধন করছে দুদক।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিএনসিসিতে বাসা বাড়ির ময়লা আর্বজনা সংগ্রহ করে নির্ধারিত ‘এস টিএস-এ’ নেয়ার জন্য ভ্যান সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। প্রতিটি ওয়ার্ডে ময়লা টানার ঠিকাদার ভ্যান সার্ভিসের মালিক ও কর্মচারীরা ডিএনসিসির প্রশাসনকে পাত্তা দেয় না। ময়লা টানার লোকজন নগরবাসীকে জিম্মি করে ইচ্ছা মাফিক প্রতি পরিবার, দোকান ও অফিস থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ফলে পুরো নগরীতে বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়েসহ সবাই ময়লা টানার লোকজনের কাছে জিম্মি। চাহিদা মাফিক টাকা না দিলে বাসাবাড়ির ময়লা ফেলে রাখে। যে প্রশাসন ডিএনসিসিতে ৫৪টি ওয়ার্ডের ময়লা টানার ভ্যান সার্ভিসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। তারা আসছেন রাজধানীতে কয়েক লাখ বাড়ির প্রভাবশালী ও সংঘবদ্ধ মালিকদের বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে।
ডিএনসিসিতে বাড়ির মালিকরা বছরের ১২ মাসের ভাড়ার টাকার মধ্যে ১০ মাসের ভাড়ার টাকার ওপর শতকরা ১২ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করার আইন ও বিধিতে উল্লেখ্য করা আছে। আদায় করা ভাড়ার ওপর সঠিকভাবে ১২ শতাংশ ট্যাক্স আদায় হলে ডিএনসিসির বার্ষিক বাজেটের ৮০ শতাংশ যোগান সম্ভব হতো। কিন্তু বাড়ির মালিকরা আদায় করা ভাড়ার টাকার ১০ ভাগের দুইভাগও হোল্ডিং ট্যাক্স দেয় না।
আরো হাস্যকর বর্তমান প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ নিজেই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বনানীর বোরাক টাওয়ার ৯ হোটেল শেরাটন) গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার বড় বড় ভবনের কোটি টাকার ট্যাক্স বকেয়া আংশিক আদায়ের মাধ্যমে মালিকপক্ষকে ছাড় দেওয়ার অনেক অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের কয়েকটি নির্দেশনা জারি:
এদিকে আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) গুলশান-২ এর নগর ভবনে ‘ঢাকার বাড়িভাড়া সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশবিষয়ক’ সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ এ বিষয়টি নির্ধারণ করে দেন। এ সময় তিনি ভাড়াটিয়ার অধিকার নিশ্চিতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ নিয়ন্ত্রকের পক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রদত্ত নির্দেশিকা পড়েন।
১. বাড়ির মালিক অবশ্যই তার বাড়িটি বসবাসের উপযোগী করে রাখবেন। ২. বাড়িতে ইউটিলিটি সার্ভিসেস (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) এর নিরবচ্ছিন্ন কানেকশন, দৈনিক গৃহস্থালি বর্জ্য কালেকশনসহ অন্যান্য সব সুবিধাসমূহ নিশ্চিত করতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় বা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে ভাড়াটিয়া সংশ্লিষ্ট বাড়িওয়ালাকে অবগত করবেন এবং বাড়িওয়ালা অতিদ্রুত সেই সমস্যা সমাধান করবেন। ৩. বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া (বাড়িওয়ালার প্রাক অনুমোদনসাপেক্ষে) বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং বাড়ির সামনের উন্মুক্ত স্থানে সবুজায়ন (ফুল/ফল/সবজি) করবেন।
৪. সাম্প্রতিককালে ভবনে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প, ইত্যাদি নানা ধরনের মনুষ্য সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানিসহ সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। এমতাবস্থায়, নিরাপত্তার স্বার্থে। বাড়িওয়ালা তার প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে ছাদের ও মূল গেটের চাবি শর্তসাপেক্ষে প্রদান করবেন।
৫. ভাড়াটিয়া মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাড়িওয়ালাকে ভাড়া প্রদান করবেন। বাড়িওয়ালাদের অবশ্যই প্রমাণ কপি হিসেবে ভাড়াটিয়াকে প্রতিমাসে মাসিক ভাড়ার লিখিত রসিদ প্রদান করতে হবে এবং প্রতি মাসের ভাড়া। দেওয়ার সময় ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালার কাছ থেকে ভাড়া প্রাপ্তির স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত রসিদ সংগ্রহ করবেন।
৬. বাড়িতে ভাড়াটিয়ার যে কোনো সময়ে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকবে। বাড়ির সার্বিক নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিতে বাড়িওয়ালা কোনো পদক্ষেপ নিলে অবশ্যই ভাড়াটিয়াকে অবগত করবেন এবং বাস্তবায়নের পূর্বে মতামত গ্রহণ করবেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে যুক্তি/ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৭. মানসম্মত ভাড়া কার্যকরী হওয়ার তারিখ হতে দুই বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। ভাড়া বৃদ্ধির সময় হবে জুন-জুলাই। ৮. দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই বাড়ির ভাড়া বাড়ানো যাবে না। দুই বছর পর মানসম্মত। দ্বিপাক্ষিক আলোচনাসাপেক্ষে ভাড়ার পরিবর্তন করা যাবে।
৯. নির্দিষ্ট সময় ভাড়াটিয়া ভাড়া প্রদান করতে ব্যর্থ হলে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে মৌখিকভাবে সতর্ক করবেন এবং নিয়মিত ভাড়া প্রদানের জন্য তাগাদা দেবেন। তাতে ও কাজ না হলে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে সমস্ত বকেয়া। প্রদান করে ২ মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার জন্য লিখিত সতর্কতামূলক নোটিশ প্রদান করবেন এবং ভাড়াটিয়ার সঙ্গে পূর্বে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিল করে উচ্ছেদ করতে পারবেন।
১০. আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে, বাড়িভাড়ার চুক্তি বাতিল করতে হলে দুই মাসের নোটিশ দিয়ে উভয়পক্ষ ভাড়া চুক্তি বাতিল করতে পারবেন। ১১. মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করা ও ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়িভাড়ার বাজারমূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হবে না।
১২. বাড়িওয়ালার সঙ্গে লিখিত চুক্তিতে কী কী শর্তে ভাড়া দেওয়া হলো এবং করণীয় কী, সেসব নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। চুক্তিপত্রে ভাড়া বাড়ানো, অগ্রিম জমা ও কখন বাড়ি ছাড়বেন তা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। ১৩. বাড়িভাড়া নেওয়ার সময় ১-৩ মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না। ১৪. সিটি করপোরেশন এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি এবং ভাড়াটিয়াদের সমিতি গঠন করতে হবে। উভয়পক্ষের প্রতিনিধিরা স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ে ভাড়ার বিবাদের সালিশে থাকবেন।
১৫. যে কোনো সমস্যা ওয়ার্ড/ জোনভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি এবং ভাড়াটিয়াদের সমিতির আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। যদি সমাধান না হয়, পরবর্তীতে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর জানাতে হবে। ১৬. ভাড়াটিয়ার অধিকার নিশ্চিতে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ নিয়ন্ত্রকের পক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রদত্ত নির্দেশিকা ভাড়াটিয়া এবং বাড়িওয়ালাদের মেনে চলার জন্য সচেতন করা, এ ব্যাপারে কোনো জটিলতার সৃষ্টি হলে সিটি করপোরেশনের জোনভিত্তিক মতবিনিময় ও আলোচনাসভা করা।
প্রশ্ন উঠেছে যে সংস্থা ভ্যান সার্ভিসের মালিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর তারা যাবে বাড়ির মালিক এবং ভাড়াটিয়েদের বিরোধ মিটাতে দেনদরবার করতে। এসব হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই না।
আ. দৈ./কাশেম