বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন রেকর্ড স্থাপন করতে যাচ্ছে ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বে পরিচালিত দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক)। ইতোমধ্যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার,ওই সরকারের সহযোগী, দোসর,প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ এবং বিদেশে অর্থপাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে।
আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই সাবেক শেখ হাসিনার পরিবার, দুর্নীতিবাজ,বিদেশে অর্থ পাচারকারী সাবেক ন্ত্রী,এমপি,নেতা,আমলা এবং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার টার্গেট রয়েছে।
এছাড়াও এবার দুদকের ভেতরের চিহ্নিত, প্রভাবশালী দুনীতিবাজ ও চাকরির সুবাধে অঢেল অবৈধ সম্পদের মালিক পদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে বর্তমান কমিশন। ইতোমধ্যে দুদকের সাবেক দুই কমিশনারসহ বেশ কয়জনের বিরুদ্ধে অনুসন্দান এবং তদন্ত চলমান রয়েছে। এসব নিয়ে দুদকের ভেতরে মহাআতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানা যায়।
এদিকে গতকাল বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুদক ও টিআইবি নতুন করে ৫ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারক চুক্তি অনুষ্ঠানে দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেছেন,আগামী দুই মাসের মধ্যে শেখ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম শেষ করা হচ্ছে।একই সাথে দুদকের ভেতরের দুর্নীতি প্রতিরোধের কাজও শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে বিচারিক আদালতে দুদকের করা মামলাগুলো বিচারিক আদালতে বিরতিহীনভাবে নিষ্পত্তির কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র মতে, দুদকের মামলার আসামিদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা, রেহানার মেয়ে যুক্তরাজ্যের এমপি টিউলিপ সিদ্দিক, আজমিনা সিদ্দিক ও ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম বেশ এগিয়ে চলছে। এছাড়া শেখ রেহানার দেবর ও শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধের মামলার বিচারিক কাজও দ্রুত শেষ করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতে অগ্রাধীকার ভিত্তিতে দুদকের মামলাগুলোর শোনানি চলছে।
ী শেখ হাসিনার পরিবারের জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৬০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে ৬টি মামলার বিচার দ্রুত শেষ হচ্ছে।গত জানুয়ারিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের ৭ সদস্যদের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা করে দুদক। পরে গত ১০ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্রের দায়েরের অনুমোদন দেয় দুদক। এরপর গত এপ্রিলে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক, আজমিনা সিদ্দিক ও ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এছাড়া গত ২৭ জুলাই অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। গত ১৪ আগস্ট প্রায় ৬০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে মামলা দুদক।
আরো জানা যায়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে রাজউকের প্লট জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, প্রতারাণাসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগে ৪টি মামলা করেছে দুদক। বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থার পরিচালক হতে বিএসএমএমইউতে শিক্ষকতার ভুয়া যোগ্যতা দেখান সায়মা ওয়াজেদ। এমন অভিযোগে গত ২০ মার্চ পুতুলের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। একই দিন পুতুল পরিচালিত সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে ব্যাংকের করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) ফান্ডের প্রায় ৩৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলা হয়। মামলায় এক্সিম ব্যাংক ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার ও পুতুলকে আসামি করা হয়। সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে টাকা আত্মসাৎ ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে গত ১ সেপ্টেম্বর পুতুলসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
দুদক শেখ রেহেনার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে পূর্বাচলে প্লট নেওয়ার অভিযোগে মামলা করেছে। গত এপ্রিলে ঢাকার গুলশানের একটি প্লট অবৈধভাবে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করিয়ে দিয়ে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে একটি ফ্ল্যাট নেওয়ার অভিযোগে টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সামরিক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে গত ১৭ এপ্রিল পৃথক অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থপাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ৪ টি মামলা করেছে দুদক। এর আগে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ৩টি বিমানবন্দরে চার প্রকল্পে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে গত ২৭ জানুয়ারি মামলা করে দুদক। গত বছরের ডিসেম্বরে তারিক সিদ্দিকির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
শেখ রেহানার স্বামী শফিক আহমেদ সিদ্দিকির বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের গবেষণা শাখা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) নামে অর্থ লোপাটের অভিযোগে শিগগিরই আরও একটি মামলা হবে।এই মামলায় আসামি হচ্ছে সজীব ওয়াজেদ জয়, আজমিনা ও রাদওয়ান মুজিব ববি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ’অভিযোগগুলো নিয়ে অনুসন্ধানে দুদকের দল কাজ করছে। যেসব ক্ষেত্রে দেশের বাইরে থেকে অনেক তথ্যাদি সংগ্রহ করতে হয়; সেক্ষেত্রে অনেক জায়গায় এমএলআর (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট) পাঠিয়েছি।’
সূত্র মতে, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগী, কোটি কোটি টাকা লোপাটকারী, দেশের অর্থ বিদেশের পাচারকারী ও চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ সাবেক মন্ত্রী,এমপি, নেতা, আমলা, সরকারি চাকরিজীবী এবং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা সিংহভাগ মামলায় বিচারিক আদালতে সাজা হওয়ার হতে পারে। আর দুর্নীতি ও ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগের মামলায় বিচারিক আদালতের সাজা প্রাপ্তদের আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হবার সুযোগ থাকবে না।
তবে উচ্চ আদালত সাজাপাপ্ত আসামিদের সাজা মওকূপ কিংবা সাজা স্থাগিত করলে, হয়তো বা বিশেষ বিবেচনায় নির্বাচনে প্রার্থী হবার সুযোগ পেতে পারেন। এছাড়াও গতবছর জুল্ইা-আগস্ট ছাত্র জনতার গণআন্দোলন দমনকালে রাজধানীসহ সারাদেশে গণহত্যার অভিযোগের মামলার সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দি এবং পলাতক আসামিরাও আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হবার সুযোগ পাবেন না।
আ. দৈ./কাশেম