দেশের বহুল আলোচিত সন্ত্রাসীদের নিরাপদ গোপন আস্তানা হিসেবে চিহ্নিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুর। আন্ডারওয়ার্ল্ড বলে খ্যাত সরকারি, ব্যক্তি মালিকানাধীন ও পাহাড়ী জমি দখল গোপন আস্তানা গড়েতোলেছে অপরাধীরা। সম্প্রতি র্যাব কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব হত্যা মামলা তদন্তে বেরিয়ে আসছে অনেক অজানা তথ্য। ওই এলাকাটি আসামিসহ একাধিক সন্ত্রাসী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
এদিকে র্যাব-পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, জঙ্গল ছলিমপুরে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর ‘তিন তলার আন্ডারওয়ার্ল্ড’। পাহাড়ের নিচের অংশে দিনে শ্রমিক কলোনির মতো স্বাভাবিক দৃশ্য থাকলেও রাত নামলেই তা রূপ নেয় অপরাধীদের ট্রানজিট জোনে। আর পাহাড়ের চূড়ায় গোপনে মজুত রাখা হয়েছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ। র্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার আসামিদের পাশাপাশি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কয়েকটি গ্রুপ এবং সীতাকুণ্ড-বায়েজিদ এলাকার পরিচিত সন্ত্রাসীরা এখন ছলিমপুর পাহাড়কে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে।
স্থানীয়রা গণমাধ্যমকে জানান, দিনের বেলায় পাহাড়ের নিচের অংশে সাধারণ শ্রমিকদের চলাচল দেখা গেলেও রাত গভীর হলে দলবেঁধে মানুষ উপরের দিকে যাতায়াত করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির খবর পেলেই তারা অল্প সময়ের মধ্যে আত্মগোপনে চলে যায়। মামলার কয়েকজন আসামিকে নিয়মিতভাবে পাহাড়ের তিনটি নির্দিষ্ট স্থানে দেখা গেছে। যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই জমি দখল, মারামারি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল, তাদের পুরোনো নেটওয়ার্কই এখন নতুন করে আত্মগোপনে সহায়তা করছে।
পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, বর্তমানে ছলিমপুরে আত্মগোপনে থাকা অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করছে দুই-তিনটি ছোট উপদল। পাহাড়ের বিভিন্ন ছড়া, শুকনা ঝরনা ও গহিন অংশে তারা ছোট ছোট সেফ রুম তৈরি করেছে। দিনের বেলায় তারা শ্রমিক, টেম্পুচালক কিংবা চায়ের দোকানের কর্মচারী সেজে থাকে। রাত হলেই পাহাড়ের উঁচু অংশে উঠে যায়। সেখানে আলাদা পাহারাদার মোতায়েন থাকে। পাহাড়ের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে ‘চূড়ার কক্ষ’ নামে পরিচিত, যেখানে রাতের অন্ধকারে লাইট বন্ধ রেখেও পাহারা দেওয়া হয়।
র্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাহাড়ের ভেতরে এমন কিছু কক্ষ রয়েছে, যেগুলো অন্তত ১০-১৫ বছর ধরে অচিহ্নিত অবস্থায় পড়ে আছে। পুরোনো কাঠের দরজা ও ছেঁড়া টিন দেখে ভেতরে অস্ত্র থাকার কোনো আভাস মেলে না। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর কয়েকজন গডফাদার তাদের অস্ত্রের ব্যাকআপ স্টক এসব জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে।
চব্বিশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ছাত্রলীগের নেতৃত্বহীন হয়ে পড়া কয়েকটি গ্রুপ ছলিমপুরে আশ্রয় নেয়। যারা আগে দলীয় শোডাউন ও হামলায় সক্রিয় ছিল, তাদের অন্তত এক ডজন সদস্য এখন নিয়মিতভাবে এ পাহাড়ে অবস্থান করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড়ের পুরোনো দখলদার চক্রের কয়েকজন। ফলে ছাত্রলীগের একটি অংশ ও স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। পাহাড় পাহারা দেওয়া, অস্ত্র বহন, তথ্য আদান-প্রদান ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল নিশ্চিত করার কাজ তারা একসঙ্গে করছে।
জঙ্গল ছলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত একটি ‘ম্যান মেড নির্বাসিত এলাকা’। এখানে প্রশাসনের স্থায়ী উপস্থিতি নেই এবং মোবাইল নেটওয়ার্কও প্রায়ই অকার্যকর থাকে। সন্ত্রাসীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ওয়াকিটকি ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে রাতে পাহাড়ে ওঠা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও প্রবেশের আগে স্থানীয় রাজনৈতিক ‘উপনেতা’ বা দখলদারদের কথা শুনে তবেই অভিযান চালায়। এতে অপরাধীরা আরো বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, অভিযানের পর সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেলেও প্রতিশোধ নিতে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালানো হয়। ফলে পাহাড়ের উপরের অংশ এখন পুরোপুরি ‘নো গো জোনে’ পরিণত হয়েছে। মোহাম্মদ ফয়সাল ওই মাদরাসার সাবেক পরিচালকের আগের স্ত্রীর সন্তান হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে মাদরাসাটিকে নিজের ব্যক্তিগত আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। তার চলাচলের জন্য ব্যবহৃত ইয়ামাহা এমটি-১৫ মোটরসাইকেল (চট্ট মেট্রো-ল ২১-০৯১৭) নিয়মিতভাবে মাদরাসার সামনে দেখা যায়।
আশপাশের লোকজন জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাকে এ মোটরসাইকেলে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।
মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী জানান, ফয়সাল দীর্ঘদিন ধরে অবাধে সেখানে যাতায়াত করত। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পর বাইরের আরো কয়েকজন সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে মাদরাসা পরিচালনা কমিটি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।
র্যাব-৭-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ও গণমাধ্যম শাখার সিনিয়র সহকারী পরিচালক এআরএম মোজাফফর হোসেন আমার দেশকে বলেন, র্যাব কর্মকর্তা হত্যার পর থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জঙ্গল ছলিমপুরে কোনো সন্ত্রাসীকে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আ. দৈ./কাশেম