ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) প্রতিষ্ঠার চার দশকের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মোট ৩৮টি বিভাগ। এর মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ হাতে গোনা কয়েকটা, নতুন বিভাগ ২ টি। প্রতি বিভাগে ২০ জন শিক্ষক থাকা উচিত এমন শর্তে ৩৮ বিভাগে শিক্ষকের প্রয়োজন ৭৬০ জন শিক্ষক। তবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সংখ্যা ৪১২ জন। তীব্র শিক্ষক সংকটে গুণগত শিক্ষার চরম ব্যঘাত ঘটছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
তীব্র এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা অব্যহত রাখতে চাইলেও বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাবের বাঁধা ও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে নিয়োগ বোর্ড স্থগিতের অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে গত গতকাল সোমবার (২৬ জানুয়ারি) কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগে সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক পদে নিয়োগ বোর্ডে, বিভাগীয় সভাপতি আপগ্রেডিং বোর্ডে উপস্থিত থাকলেও প্রভাষক পদের নিয়োগ বোর্ডে অনুপস্থিত থাকাকে কেন্দ্র করে ফুঁসে উঠে ছাত্র সমাজ। বিক্ষোভ মিছিল সহ প্রশাসন ভবনে তালা লাগিয়ে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা। এ সময় ছাত্রদল ছাড়া প্রায় সকল ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ'সহ সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষক সংকটে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, বিভাগে মাত্র দুইজন শিক্ষক পরবর্তীতে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিভাগে পাঁচটি শিক্ষাবর্ষ চলমান রয়েছে। এমতাবস্থায়, শিক্ষকরা পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বটে কিন্তু পূর্ণাঙ্গভাবে পাঠদান করতে পারছেন না। বিভাগে দ্রুত নতুন শিক্ষক প্রয়োজন যাতে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারেন।
অপর বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, পছন্দের সাবজেক্টের জন্য ইবিতে ভর্তি হয়েছিলাম তবে তীব্র শিক্ষক সংকট দেখে হতাশ হয়েছি। চলমান শিক্ষাবর্ষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শিক্ষকদের উপর অতিরিক্ত চাপ হয়ে যায়। ফলে তারাও ঠিকঠাক মতো ক্লাস নিতে পারেন না। নন-ডিপার্টমেন্টের ক্লাসগুলো মাঝে মধ্যে উনারা নিতে পারেন না ব্যস্ততার কারণে। এই সংকট কাটিয়ে ওঠা খুবই জরুরি।
শিক্ষক সংকট এমন কয়েকটি বিভাগের শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিভাগগুলোয় শিক্ষক কম থাকায় ছয়টা শিক্ষাবর্ষের ছয়ের অধিক কোর্স নিতে হয়। এর মধ্যে নিজের গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের পরিক্ষা'সহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন না। ফলে গুণগত শিক্ষা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক বিভাগে শিক্ষকরা পর্যাপ্ত ক্লাস না নিয়ে কোর্স শেষ করেন।
গুণগত শিক্ষার মান নিয়ে এক বিভাগের শিক্ষক বলেন, আমাদের শিক্ষক সংকট থাকায় বাইরে থেকে গেস্ট টিচার আনতে হয়। বিভাগের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য যতটুকু আউটপুট দিতে পারেন একজন বাইরের শিক্ষক সেটা দিতে পারেন না। শিক্ষক সংকটের কারণে কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস করার কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হতে হয়।
আইকিউএসি পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ নাজিমুদ্দিন বলেন, কাউন্সিল চায় প্রতি ব্যাচে ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকতে পারবে না। আমাদের যেহেতু শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি সেহেতু আমরা চাই ৪০ জন করে দুই শিফটে ভাগ করে নিবো। তাহলে তো আমাদের ১০৮০ জন শিক্ষক দরকার। তাছাড়া প্রতি বিভাগে ২০ জন শিক্ষক থাকা উচিত সেই হিসেবে ৩৮ টি বিভাগে ৭৬০ জন শিক্ষক থাকা দরকার। আমাদের ১০৮০ জন দরকার নাই ৭৬০ জন শিক্ষক দিক কাউন্সিল। কিন্তু আমাদের সেই পরিমাণ শিক্ষকও নাই। এজন্য আমাদের সেশনজট লেগে থাকে।
তিনি আরও বলেন, নতুন বিভাগে ক্লাস হয় না বরং শুধু পরীক্ষা হয়। আল্টিমেটলি শিক্ষার্থীরা কিছু শিখতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে শিক্ষক নিয়োগ হলে আমাদের শিক্ষার্থীরা শিক্ষক হতে পারছে না। আমাদের রিসার্চ থেকে শুরু করে মানসম্মত শিক্ষক গড়ে তুলতে পারছি না।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রোকসানা মিলি বলেন, প্রতিটি কোর্সে মিনিমাম ৪০ ঘন্টা ক্লাস হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের রিসোর্সের অভাবে সেটা সম্ভব হয় না। ফলে পর্যাপ্ত ক্লাস হওয়ার আগেই কোর্স শেষ হয়ে যায়। তবে অন্তত ২০ টা ক্লাসের আগে কোর্স শেষ করা উচিত নয়। শিক্ষার্থীদের ক্লাসের সাথে ইনভলভমেন্ট বাড়াতে হবে। নাহলে শিক্ষার্থীদের অনাকাঙ্ক্ষিত মুভমেন্ট বেড়ে যায়। এজন্য আমাদের শিক্ষক রিসোর্স বৃদ্ধির দিকে নজর দেয়া উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট উত্তোরণের জন্য গত মার্চ মাস থেকে কাজ শুরু করেছি। বিভিন্ন কারণে সময় বিলম্ব হয়েছে। ইউজিসির নিয়মতান্ত্রিক ভাবে নিয়োগ বোর্ড চলমান রেখেছি। কে বা কারা নিয়োগ বোর্ড স্থগিত করতে চাই তা সবাই জানে। এটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে নিয়োগ বোর্ড স্থগিত হয়নি। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আচরণ দেখে খুবই শকড কিন্তু ভীত নই। নিয়োগ বোর্ড নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলবে। সরাসরি কেউ চাপ দিচ্ছে না। তবে নিয়োগ বন্ধের জন্য ইউট্যাব চিঠি দিয়েছিল।
আ. দৈ./কাশেম