বাংলাদেশের ১৮ রাষ্ট্রপতি: কে কতদিন দায়িত্ব পালন করেছেন
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনয়নের মাধ্যমে সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতির বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা রয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৮ জন ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে পূর্ণ মেয়াদের পাশাপাশি অস্থায়ী ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিও রয়েছেন। কে কখন এবং কতদিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন, তা তুলে ধরা হলো—
শেখ মুজিবুর রহমান
মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। তবে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় তার অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসন চালু হলে তিনি আবার রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। ফলে তিনি বাংলাদেশের প্রথম ও পঞ্চম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম
শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে বন্দি থাকাকালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হওয়ার পর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।
মুহম্মদুল্লাহ
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
পরে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এবং ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালুর মধ্য দিয়ে তার রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হয়।
খন্দকার মোশতাক আহমদ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদীয় মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম
খন্দকার মোশতাক আহমদের পর ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।
তবে সে সময় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক পদ থাকলেও কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতার বড় অংশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পদত্যাগ করেন তিনি।
জিয়াউর রহমান
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
পরবর্তীতে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন এবং নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
আবদুস সাত্তার
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
পরে একই বছরের ২০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন তিনি। তবে চার মাসের মাথায় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দীন চৌধুরী
আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করার তিন দিন পর, ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দীন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।প্রায় নয় মাস দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি পদ ছাড়েন।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এর আগে তিনি ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পরও তিনি রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকেন। শেষ পর্যন্ত ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ
এরশাদের পতনের পর ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ।
তার নেতৃত্বে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় এবং ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দায়িত্ব শেষে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়েন।
পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি পদ থেকে বিদায় নেন। দুই দফায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
আবদুর রহমান বিশ্বাস
সাহাবুদ্দিন আহমদের প্রথম মেয়াদ শেষে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি হন আবদুর রহমান বিশ্বাস।
এর আগে তিনি সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নিজের মেয়াদ পূর্ণ করে ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন তিনি।
এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশের ১৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
তিনি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তবে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ২০০২ সালের ২১ জুন, মাত্র কয়েক মাসের মাথায় রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার।
তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন।
ইয়াজউদ্দিন আহমদ
২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের সময় তিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। পরে প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়লেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকেন।
নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তিনি ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন।
মো. জিল্লুর রহমান
আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতি হন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা মো. জিল্লুর রহমান। এর আগে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মো. আবদুল হামিদ
বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন মো. আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান অসুস্থ থাকায় ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের ২০ মার্চ থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং ২৪ এপ্রিল থেকে পূর্ণ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পদ ছাড়েন।
মো. সাহাবুদ্দিন
আবদুল হামিদের দুই মেয়াদের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ও তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। পরে শারীরিক জটিলতার কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সুত্র বিবিসি
আ.দৈ/এসআর
























