রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আয়নাঘরে নির্যাতনের নির্মমতা গোসল-টয়লেটে বেশি সময় নিলে পেটানো হতো
নিজেস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম   (ভিজিট : ৫৮)
X

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম থাকা অবস্থায় দাঁত ব্রাশ, গোসল, টয়লেট ও ওজু করার জন্য সর্বোচ্চ দুই মিনিট সময় দেওয়া হতো। একটু সময় বেশি লাগলে সারাদিন তাকে পেটানো হতো। কোনো খাবার দেওয়া হতো না।   এমনই অমানবিক আচরণের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গতকাল বুধবার  আগস্ট) জবানবন্দি দিয়েছেন গুমের শিকার মো. নূরে আলম। ওইদিন ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি পেশ করেন তিনি। 

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সপ্তম সাক্ষী হিসেবে তিনি জবানবন্দিতে ডিজিএফআইয়ের জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার) সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় বর্ননা করেন। 
২০১৬ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগ শাখা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালনের সময় গুমের শিকার হন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন নূরে আলম। তখন তিনি নিয়মিত ফেসবুকে বিএনপির পক্ষে এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন বলেও জবানিতে উল্লেখ করেন।

২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল রাতে নীলফামারীর বাড়ি থেকে ৩০-৩৫ জন লোক মাইক্রোবাসে তাকে তুলে আনে উল্লেখ করে জবানবন্দিতে নূরে আলম বলেন, একটি কক্ষে রাখার পর তার হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। সেই কক্ষে কোনো জানালা ছিল না। সেখানে একটি চৌকি, একটি বালিশ, একটি কোরআন শরিফ, একটি জায়নামাজ ও প্রস্রাবের একটি পট দেখতে পান। সেই কক্ষটি ছিল প্রায় ৮ ফুট বাই ১১ ফুট। একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব ২৪ ঘণ্টা জ্বালানো থাকতো।

সেখানে থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর খবর প্রচারিত হলে মাইকে ‘পূর্ব কাফরুল নিবাসী’ শব্দটি শুনতে পেতেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নূরে আলম। এতে বুঝতে পারেন, সেনানিবাসের কোথাও গুম আছেন তিনি।

গুম হওয়ার প্রথম দিন বিকেলে কক্ষে দুজন ব্যক্তি প্রবেশ করে তার হাতে হ্যান্ডকাফ পরান ও চোখ বেঁধে ফেলেন উল্লেখ করে সাক্ষীর জবানবন্দিতে নূরে আলম বলেন, কক্ষ থেকে বের করে কিছুদূর নিয়ে তাকে টুলের ওপর বসান। সেখানে তার রক্তচাপ ও তাপমাত্রা মাপেন এবং তার আর কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে কি না, তা জিজ্ঞাসা করেন। টুল থেকে তুলে তাকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে আরেকটি টুলে বসান। সেখানে এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তিনি বিএনপির রাজনীতি করেন, কেন হাসিনা সরকার ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন।

তিনি জানান, তাকে তুলে আনার কারণ জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি রেগে যান এবং তাকে বলেন, ‘রেললাইনের পাশে, নদীনালার পাশে এবং বস্তাবন্দি যেসব লাশ পাওয়া যায়, তা আমরাই করি। তোকে যেভাবে বলব, সেভাবেই থাকবি, যেভাবে বলব, সেভাবেই চলবি, তাহলে ভালো থাকবি এবং যেভাবে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসছি, সেভাবে বাসায় রেখে আসবো।’ এরপর সেই ব্যক্তি তার দুই হাঁটু ও ঊরুতে বেধড়ক পেটান।

পরে একজন নারী তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন উল্লেখ করে নূরে আলম বলেন, তার কাছেও তুলে আনার কারণ জানতে চান তিনি। এই প্রশ্নে তিনিও অত্যন্ত রাগান্বিত হন। হ্যান্ডকাফ খুলে ফেলে দড়ি দিয়ে তার হাত বাঁধেন। কোনো একটি আংটার সঙ্গে রশি বেঁধে তাকে ঝুলানো হয়। তার কোমর থেকে পা পর্যন্ত বেধড়ক পেটান। পরে হাতে কয়েকটি কাগজ ও কলম দিয়ে বলা হয়, ‘যাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছিস, তাদের নাম লিখে নিয়ে আয়।’

এখানে বন্দি থাকায় অবস্থায় তাকে পাঁচ থেকে ছয়বার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নূরে আলম বলেন, আমার কক্ষের ভেতর সিসিটিভি লাগানো ছিল। সেখানে থাকা অবস্থায় প্রথম কয়েক দিন তাকে ঘুমাতে দিতেন না। ঘুমালে লোহার দরজায় প্রচণ্ড শব্দ করা হতো। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিরা সব সময় মাস্ক পরে দায়িত্ব পালন করতেন, যেন তাদের চেনা না যায়।

১৪ থেকে ১৫ দিন পর তাকে একই ভবনের আরেকটি কক্ষে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে ২০১৬ সালের ২৬ জুন তাকে অন্য জায়গায় নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নূরে আলম।  তিনি বলেন, নতুন জায়গায় আমার হাত দুটি দরজার লোহার শিকের বাইরে নিয়ে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে প্রায় ৪০ দিন রাখা হয়। কোনো কথা বললে দুই হাতে এবং কাঁধে প্রচণ্ড আঘাত করা হতো। সেখানে থাকা অবস্থায় খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ি, কিন্তু কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।

সব সময় হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে রাখার কারণে তার হাতে ঘা হয়ে যায় এবং ঘা থেকে রক্ত পড়তো উল্লেখ করে জবানবন্দিতে নূরে আলম বলেন, চোখ ও কান সব সময় বাঁধা থাকার কারণে কানে ঘা হয়েছিল। একপর্যায়ে সারা শরীরে ঘামাচি হয়। ঘামাচির কারণে লোহার শিকের সঙ্গে পিঠ ঘষতাম। এতে পিঠেও ক্ষতের সৃষ্টি হয়।

জেআইসিতে গুম করে রাখার এই মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে তিনজন ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন। তারা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। 

 এ মামলার অন্য ১০ আসামি পলাতক। তাদের মধ্যে আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।

পলাতক আসামিদের মধ্যে আরও আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।

আ. দৈ./কাশেম


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : [email protected]

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝