হঠাৎ রাজধানীসহ সারাদেশে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাড়ানো হয়েছে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম। পরিকল্পিতভাবে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষকে জিম্মিকরে ইচ্ছামাফিক দাম বাড়িয়েছে এলপিজি সিলিন্ডারের। চলতি শীতে বাসা বাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের লাইনের চাপ কম থাকার সুযোগে হঠাৎ দাম বাড়িয়েছে সিন্ডিকের লোকজন।
মানুষকে বেকায়দায় ফেলে রাতারাতি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার কৌশল হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে।এসব দেখার যেকোন কেউ নেই। প্রশাসনের নিরবতার সুযোগে সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের লাগাম টেনে ধরার অনুরোধ এসেছে জনগণের পক্ষ থেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এবার বছরের শুরুতেই বাজারে সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হলেও দোকানদার লোকজনের কাছে ১৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন। জনগণ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫৪৭ টাকা বেশি দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে মিরপুর শেওড়া পাড়ার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বাসায় গ্যাস সংযোগ না থাকায় রান্নার জন্য এলপিজির ওপরই নির্ভর করতে হয়। দাম বেড়েছে, এমন খবর আমার জানা ছিল না। দোকানে এসে জানতে পারি, ১ হাজার ২৫৩ টাকার সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকা চাচ্ছে, পরে অনেক অনুরোধ করে ১ হাজার ৮০০ টাকায় কিনতে হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব দেখার কি কেউ নেই? এ দায় কার? তাদের লাগাম টেনে ধরার দরকার।
শুধু রাকিব হাসানই নন, গ্যাস সংযোগ না থাকায় তার মতো অনেকেই এখন বিপাকে পড়েছেন। এলপিজি সিলিন্ডারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ।
আরমান হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, আমি চারটি দোকান ঘুরেও কোথাও ভিন্ন দাম পাননি, সব জায়গায় একই দামই চাওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে দুই হাজার টাকায় এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।পত্রিকায় দেখলাম গ্যাসের দাম বেড়েছে।
ডিটেইল জানি না, আই হ্যাভ নো আইডিয়া। সরবরাহ ঘাটতির কারণে এমনটা হতে পারে, সরবরাহে কেন হঠাৎ ঘাটতি হলো সেটি জানা নেই। ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ের তারতম্যে এমনটা হতে পারে। ওমেরা এলপিজির ডিরেক্টর ড. এম তামিম ,তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এত বেশি দাম বাড়ার কারণ কী এবং কম দামে সিলিন্ডার কোথায় পাওয়া যাবে? একই সঙ্গে তিনি জানান, অনেক দোকানেই গ্যাসের সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে, ফেসবুকে কাজী অনিক লিখেছেন, নীরবে সিলিন্ডার গ্যাসের হরিলুট চলছে। তার ভাষায়, এক হাজার ৩০০ টাকার বোতল এখন ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত কয়েক দিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার কেনার এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে। একদিকে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেশি, অন্যদিকে অনেক জায়গায় চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডারও পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্রাহকদের অভিযোগ, হঠাৎ এভাবে দাম বেড়ে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। আগে কখনো কখনো ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি নিলেও এবার একলাফে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে সিলিন্ডারের সরবরাহ কম থাকায় তাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, ফলে বিক্রির দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। রাজধানীর আদাবর এলাকার সিলিন্ডার বিক্রেতা রিয়াজুল হোসেন বলেন, বর্তমানে বাজারে সিলিন্ডারের সংকট রয়েছে। এ কারণে দাম বেশি। তার ভাষায়, তাদেরও এক হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকায় সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে গাড়িভাড়া ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ায় বিক্রির দাম বেড়েছে। তিনি বলেন, আমরা ইচ্ছা করে বেশি দামে বিক্রি করছি না, বরং বাড়তি দামে কিনে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
প্রতি মাসে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ডিসেম্বর মাসের ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ভোক্তা পর্যায়ে এক হাজার ২৫৩ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। নিয়ম অনুযায়ী, এই দাম আগামী ৪ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। ওই দিন জানুয়ারি মাসের জন্য নতুন দাম ঘোষণা করবে বিইআরসি, যা ঘোষণা শেষে সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হবে। তবে কোনো ধরনের নতুন ঘোষণা ছাড়াই খোলা বাজারে হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, সময়মতো এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে না পারায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে হঠাৎ করেই বাজারে তীব্র সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে এবং দাম বেড়েছে। কিন্তু বাজারে বিদ্যমান এলপিজি আগেই আমদানি করা। নতুন করে এলপিজির দাম বৃদ্ধির ঘোষণাও আসেনি, তাহলে কেন এত বেশি দাম বেড়েছে— এমন প্রশ্নের জবাবে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তাকে দুষছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা ।
ওমেরা এলপিজির ডিরেক্টর ড. এম তামিম গণমাধ্যমকে বলেন, আমি সকালে পত্রিকায় দেখে হঠাৎ দাম বাড়ার বিষয়টি জানতে পারি। ডিটেইল জানি না, আই হ্যাভ নো আইডিয়া। সরবরাহ ঘাটতি থাকার কারণে হয়তো এমনটা হচ্ছে, সরবরাহে কেন হঠাৎ ঘাটতি তৈরি হলো সেটি জানা নেই।
ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ের ২০২১ সাল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। তা সত্ত্বেও বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে এবারের মতো এত বেশি দামে বিক্রির নজির আগে দেখা যায়নি। বিষয়টি এরই মধ্যে বিইআরসির নজরে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নিতে গত বৃহস্পতিবার এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনকে (লোয়াব) চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।
বিইআরসির চিঠিতে বলা হয়, ডিসেম্বর মাসের জন্য প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ হিসাবে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ভোক্তা পর্যায়ে ১ হাজার ২৫৩ টাকা হবে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ কমিশনের কাছে এসেছে। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, এলপিজি মজুত, বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে কোনোভাবেই বাড়তি দামে বিক্রি করা যাবে না। তাই সব পর্যায়ে নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হলো।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, সরবরাহে ঘাটতির কারণে হঠাৎ দাম বেড়ে গেছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভোক্তা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ আছে, সেসব স্থানে অভিযান পরিচালনা করতে।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে ব্যবসায়ীরা লুণ্ঠন করছে। এ লুণ্ঠন রোধের দায়িত্ব বিইআরসি, ভোক্তা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও পৌর করপোরেশন কর্তৃপক্ষের। তবে এ বিষয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা নেই।
শামসুল আলম বলেন, ‘মাথাব্যথা আছে শুধু আমার আর আপনার (সাংবাদিক) কাছে। সব খরচ জনগণ বহন করছে, অথচ তাদের প্রতি এত বড় অবিচার করা হচ্ছে।’তিনি বলেন, আইনে বলা আছে, বিইআরসি যদি আদেশ না মেনে কেউ বাড়তি দাম নেয়, তবে অর্থদণ্ড, জেল অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। তবুও কমিশন কখনো এ ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি। এমনকি ফৌজদারি অপরাধে মামলা করারও অধিকার রয়েছে, কিন্তু কখনো মামলা করা হয়নি বা কৈফিয়ত চাওয়া হয়নি। তাহলে দেশ কীভাবে চলে? এটাই কি সভ্য সমাজ, এটাই কি সভ্যতা? এ প্রশ্ন করা ছাড়া আমার আর কিছু বলার নেই।
দাম বাড়ার বিষয়টিকে বিইআরসির ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, এলপিজি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্রিটিক্যাল আইটেম। এজন্য সরকার এবং বিইআরসিকে এর ব্যবস্থাপনায় যথাযথ মনোযোগ দিতে হবে।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দাম বেড়ে যাওয়া স্পষ্টভাবে বিইআরসির ব্যর্থতা। তাদের অবশ্যই খবর রাখা উচিত, সরবরাহে ঘাটতি হবে কি হবে না। এছাড়া অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন। তিনি যোগ করেন, বাড়তি দাম মোটেও কাম্য নয়—নির্ধারিত দাম অনুযায়ীই সিলিন্ডার বিক্রি করতে হবে। কিছু পরামর্শ দিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, যেখানে বেশি গোলমাল দেখা দিচ্ছে, সেখানে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করে শাস্তি দেওয়া উচিত। বিইআরসিকে এসব জায়গা থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, যাতে সরবরাহের বর্তমান অবস্থা জানা যায়।
বুয়েটের সাবেক এ অধ্যাপক বলেন, এলপিজি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটি শিল্পখাতেও ব্যবহার হচ্ছে। তাই বিইআরসির বড় ভূমিকা রয়েছে। তাদের আরও বেশি ইন্সপেক্টর নিয়োগ করতে হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে ঠিক রাখতে হবে।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি আগে থেকেই আভাস পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ডলার পাওয়ার বা ছাড় দেওয়ার কোনো সমস্যা হলে সেটি ঠিকভাবে করা উচিত, কারণ মূল সমস্যা সরবরাহের ঘাটতি। এখনই গোলমাল হওয়াই স্বাভাবিক। সরকার চাইলে কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিতে পারে নির্ধারিত কিছু স্থানে বড় আউট,লট তৈরি করতে, যাতে সরবরাহে সমস্যা থাকলেও সাধারণ মানুষ ন্যায্য দামে এলপিজি পেতে পারে।
আ. দৈ./কাশেম