হাদি হত্যাকান্ডের রেশ এখানো যায়নি। এরই মধ্যে খুলনায় এনসিপির শ্রমিক নেতাকে গুলি করা হয়েছে। শুধু এনসিপি নেতা নয়, তফসিল ঘোষণার পর থেকে দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে।
বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাংচুর অগ্নিসংযোগের কারণে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এই পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পরিবেশ ব্যহত হওয়ার আংশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন সরকারের ভেতর বাইরে থেকে একটি গোষ্ঠি নির্বাচন বাতিলে চেষ্টা করছে। এ কারণে তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরিতেও উস্কানি দিচ্ছে।
বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভীতি কাজ করছে আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যেও। বিশেষ করে বিএনপি, এনসিপি এবং অন্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা যারা নির্বাচনী প্রচারের নেমেছে তারা অনেকটা সতর্ককার সঙ্গে পা ফেলেছেন। ইতোমধ্যে অনেক নেতাকর্মী গানম্যান এবং অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। সরকার হিটলিস্টেও থাকা ৫০ জনের গানম্যান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন ইতোমধ্যে ২০ জনের গানম্যান দেয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন গানম্যান দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। নির্বাচনে হাজার হাজার প্রার্থী হবে। সরকার কয়জনকে গানম্যান দেবে। পাশাপাশি তারা বলেন এক পক্ষ নির্বাচন বানচালে পরিস্থিতি অস্থির করে তোলার চেষ্টা করছে। এই গোষ্ঠিকে সনাক্ত করে এখনই আইনের আওতায় না আনা হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।
জনমনে আতঙ্ক আর বাড়ছে হাদি হত্যাকান্ডের এক সপ্তাহর বেশি পেরিয়ে গেলেও এখনও মুল আসামী ধরা ছোয়ার বাইরে। প্রধান আসামী নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা দেশে না, ভারত পালিয়েছে সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন হাদির হত্যকারীদের গ্রেপ্তারের মারাত্মক চেষ্টা চলছে। তবে তিনি এও বলেছেন মুল আসামীর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাকে গেপ্তার করারও সম্ভব হয়নি। নির্বাচনে আগে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার কারণে জনমনে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। তারা বলছেন নির্বাচনকে সামন্যে রেখে এই ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে। এখন থেকেই সতর্ক না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গত রোববার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রধানদের সাথে বৈঠক করেছেন নির্বাচন কমিশন। বৈঠক শেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সাথে যৌথবাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এদিকে প্রধান উপদেষ্টাও রেববার রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেন। কিন্তুবারবার নির্দেশনার পরও কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না তা নিয়েও নানা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিরা বলছেন বাহিনীগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে সমন্বয় নেই। ফলে তারা ঠিক মতো কাজ করতে পারছেন না।
হাদি হত্যাকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত মুল আসামী ফয়সাল দীর্ঘদিন ধরেই তাকে অনুসরণ করে আসছিলেন। একই সাথে তার ইনকিলাব মঞ্চের কার্যালয়ে রেকি করা হয়। এই ফয়সাল এর আগে রাজধানীর আদাবর এলাকায় ১৭ লাখ টাকা চাঁদাবাজির ঘটনায় পুলিশের হাতের গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু গ্রেপ্তারের পরপরই জামিনে বেরিয়ে আসে। শুধু তাই নয় গত আগস্টেও তার জামিনের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। ফলে এই ঘটনায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পরও এমন খুনি জামিন পায় কিভাবে। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে তারা যেসব সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করেছে তাদের বেশিরভাগই জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। সস্ত্রাসীদের এভাবে ঢালাও জামিনে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
সংশ্লিষ্টর বলছেন, নির্বাচন বন্ধ করতে ভারতের পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন। তাদের নির্দেশ মতো দেশে থাকা নেতাকর্মীরা নাশকতার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসিনার মামলার রায়ের আগের সারাদেশে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। রাস্তা বন্ধ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া, পেট্রল মেরে আগুন ধরিয়ে দেয়া, মানুষ খুন করে ঘরবাড়িতে আগুন দিতে স্বয়ং হাসিনাই অব্যাহত নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। তার নির্দেশনা পেয়ে দলটির নেতাকর্মীরা নাশকতা করছে। দলটি পাশ্বর্তী দেশের সাহায্যে দেশের নির্বাচন বানচালেরও চেষ্টা করলে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ফের জামিন নিয়ে সন্ত্রাসীদের বের হয়ে নাশকতার জড়িত থাকার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
গত ১১ ফেব্রয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। তফসিল অনুযায়ি ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমার শেষ সময়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ শুরু করেছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছেন। ফলে তারা এক ধরনের ভীতির মধ্যে রয়েছে। একই সাথে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্খিত বোধ করছেন। এ অবস্থায় সরকার রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রার্থীদের অস্ত্রের লাইসেন্স ও গামম্যান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে গানম্যান দিয়ে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নির্বাচনে প্রার্থী হবে কয়েক হাজার। কিন্তু মুষ্ঠিমেয় প্রার্থীর গানম্যান দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করা সম্ভব নয়।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ি প্রার্থীতা প্রত্যারের পর শুরু হয় নির্বাচনী প্রচারণা। কিন্তু নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগে কোন প্রার্থী হত্যাকান্ডের শিকার অথবা অন্যকোন কারণে মৃত্যুবরণ করলে সে আসনের নির্বাচন স্থগিত করার বিধান রয়েছে। নির্বাচনকে সামন্যে রেখে হাদি হত্যাকান্ডের মতো প্রার্থীরা হত্যাকান্ডের শিকার হন তাহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
যদিও এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ভোটের দিন যত এগিয়ে আসবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে। ভয় কেটে যাবে, কনফিডেন্ট আছি। আমরাতো হাল ছাড়ি নাই আমরা এগিয়ে যাবো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব প্রধান, আমরা একসঙ্গে জাতিকে একটা মেসেজ দিয়েছি যে, আমরা সবাই এক ইলেকশনের ব্যাপারে। আমরা সবাই একটা সুন্দর নির্বাচন সবাই চাই।
নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে জবাবে স্বরাষ্ট উপদেষ্টা বলেন, ঝুঁকিতে থাকা রাজনীতিবিদসহ ২০ জনকে গানম্যান দেয়া হয়েছে। ৫০ জনের মতো তালিকা আছে, যারা আক্রান্ত হতে পারেন- এ বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, যারা হিটলিস্টে বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছেন, তাদের আমরা গানম্যান দিয়েছি। আমাদের যে ডিজিএফআই, এনএসআই এবং এসবি আছে-তারা নিজেরা বসে কারা কারা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের তালিকা করেছেন। তাদের গানম্যান দেয়া হয়েছে, অনেকে অবশ্য গানম্যান নিতেও চাননি। এ পর্যন্ত ২০ জনের মতো ব্যক্তিকে গানম্যান দেয়া হয়েছে বলেও জানান উপদেষ্টা। ২০ জনের সবাই রাজনীতিবিদ কি না জানতে চাইলে উপদেষ্টা এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।