টানা চার দিনের ছুটিতে রাজধানী ঢাকা অনেকটাই ফাঁকা। কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর নগরীর চিত্র এখন অন্যরকম। প্রতিদিনের চিরচেনা যানজট, অফিসগামী মানুষের ভিড় কিংবা সড়কে গণপরিবহনের ঠাসাঠাসি কোনোটাই তেমন চোখে পড়ছে না।
ছুটির আমেজে গত বুধবার বিকেল থেকেই ঢাকা ছিল বেশ ফাঁকা। প্রধান সড়কগুলোতে স্বাভাবিক দিনের তুলনায় যানবাহন কমে গেছে কয়েকগুণ। মিরপুর, ধানমন্ডি, শাহবাগ, ফার্মগেট, মতিঝিল ও গুলিস্তানের মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোতে অবাধে চলাচল করছে সব ধরনের গাড়ি ও রিকশা।
যেসব সড়কে সাধারণত কয়েক মিনিটের পথ অতিক্রম করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়, সেখানে মাত্র কয়েক মিনিটেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন যাত্রীরা। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, ব্যাংক-বীমা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় রাজধানীতে নেমে এসেছে এক ধরনের নীরবতা।
এই শান্ত রাজধানীর পেছনে রয়েছে নগর ছাড়ার প্রবল স্রোত। শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে চার দিন ছুটি পাওয়ায় প্রিয়জনের কাছে ফিরতে লাখো মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। ফলে বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে মঙ্গলবার এবং বুধবার উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।
গাবতলী, কল্যাণপুর, ফুলবাড়িয়া, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালের টিকিট কাউন্টারের সামনে ছিল লম্বা লাইন। দক্ষিণাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলমুখী বাসগুলোতে সিট একেবারেই ফাঁকা ছিল না। অনেকেই টিকিট না পেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ভ্রমণ করেছেন। তবে গতকাল অনেকেই উপভোগ করছেন ভিন্ন রূপের ঢাকা। ফাঁকা রাস্তায় অবাধে চলাচল করছেন তারা।
পথচারীরা বলছেন, ব্যস্ত সড়কগুলোতে ভিন্ন এক দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। যেখানে সাধারণত হাঁটাহাঁটি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, সেখানে নির্ভারভাবে চলাচল করা যাচ্ছে। অনেকেই জানিয়েছেন, সাধারণ সময়ে অফিসগামী মানুষের ভিড়, যানবাহনের হর্ন আর ধাক্কাধাক্কির কারণে রাস্তায় নামা কষ্টকর হয়ে ওঠে। কিন্তু আজ রাস্তায় মানুষের চাপ কম থাকায় সহজেই চলাচল করতে পারছেন তারা।
অনেকে আবার বলছেন, নগরীর এই নিরবতা কিছুটা অচেনা মনে হলেও স্বস্তিদায়ক। বিশেষ করে বয়স্ক এবং নারী-শিশুদের জন্য এই পরিবেশে হাঁটা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে কিছু পথচারীর অভিযোগ, রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকলেও গণপরিবহন সংকট রয়েছে। বাসে যাত্রী কম থাকায় চালকরা জায়গায় জায়গায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকছেন। ফলে গন্তব্যে পৌঁছাতে ভোগান্তি হচ্ছে।
শামীম নামে এক পথচারী গতকাল বলেন, অন্যান্য দিনে শাহবাগ থেকে ফার্মগেট কিংবা মতিঝিলের সড়কগুলো পেরোনোই দুঃসহ হয়ে ওঠে। চারপাশে ভিড়, যানজট আর ধাক্কাধাক্কির চাপে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু গতকাল রাস্তাঘাট ছিল অস্বাভাবিক রকম ফাঁকা। তিনি জানান, দীর্ঘদিন পর এমন নিরিবিলি রাজধানী দেখছেন তিনি। ভিড়ের কারণে হাঁটার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হতো, কিন্তু গতকাল তিনি নির্ভরভাবে দ্রুত হাঁটতে পেরেছেন। তার কথায়, ‘এই পরিবেশ পথচারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও এক ধরনের শূন্যতাও তৈরি করেছে। কারণ ব্যস্ত শহরের হইচই হঠাৎ থেমে গেলে তা চোখে লাগে।’
বাস চালকরা বলছেন, রাজধানীতে যাত্রী সংকটের কারণে এখন গাড়িগুলো প্রায় ফাঁকাই চলছে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এখন যাত্রী না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সিট পূর্ণ হচ্ছে না। মিরপুর থেকে মতিঝিল এসব ব্যস্ত রুটে প্রতিদিন বাসগুলো যাত্রীতে ঠাসা থাকলেও, ছুটির প্রভাবে এখন বাসগুলোতে হাতেগোনা যাত্রী। ফলে নির্ধারিত ভাড়া ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
মিরপুর থেকে মতিঝিলগামী শিকড় পরিবহনের বাসচালক জব্বার জানান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র দুই-তিন রাইড দিতে পেরেছি, তাও বাসে সিটের অর্ধেক খালি। এমন অবস্থা আগে কখনো দেখিনি। আরেকজন চালক জানান, যাত্রী না থাকায় প্রতিটি ট্রিপে ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। তেলের দাম, স্টাফদের বেতনসহ নানা খরচ তুলতে না পারায় মালিকরাও চিন্তিত।
চালকদের মতে, লম্বা ছুটি পেয়ে অনেক গ্রামে গিয়েছেন। তাই ঢাকার রাস্তায় ভিড় নেই। ফলে গণপরিবহনে যাত্রীও কম। এক চালক বলেন, ‘খালি বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে মনটাই খারাপ হয়ে যায়। ছুটি শেষে মানুষ ঢাকায় ফিরবে, ভিড় বাড়বে শিগগিরই। আপাতত দিন কাটছে লোকসান দিয়েই।’
শাহবাগ মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছুটির প্রভাবে রাজধানীর যান চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সাধারণ সময় যেখানে সকাল থেকে রাত অবধি শাহবাগ মোড়সহ আশপাশের এলাকায় প্রচণ্ড যানজট লেগে থাকে, সেখানে গত বুধবার সকাল থেকে পুরো চিত্রই ভিন্ন। গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়ে অসংখ্য গাড়ি, রিকশা, বাস ও পথচারীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। কিন্তু টানা চার দিনের ছুটি প্রভাবে সেই চিরচেনা ভিড় ও কোলাহল নেই। ফলে দায়িত্ব পালনে কিছুটা স্বস্তি মিলছে। তিনি বলেন, সাধারণ সময়ে শাহবাগ থেকে টিএসসি বা কারওয়ান বাজার পর্যন্ত যেতে আধঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। গতকাল একই পথ অতিক্রম করতে সময় লেগেছে মাত্র কয়েক মিনিট। মানুষের ভিড় না থাকায় যাতায়াত নির্বিঘ্ন হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় গাড়ির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
রাজধানী এখন অনেকটাই ফাঁকা। দীর্ঘদিন ধরে যারা ঢাকার যানজটে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন, তাদের কাছে এই চিত্র যেন অচেনা। তবে এটি স্থায়ী নয়, ছুটি শেষে পুরনো চিত্র শিগগিরই ফিরবে বলে মনে করেন ওই ট্রাফিক কর্মকর্তা। তবুও কয়েক দিনের যানজটমুক্ত রাজধানী নগরবাসীর কাছে স্বস্তির।
ঢাকাবাসীদের অনেকে বলছেন, এই পরিবেশ তাদের স্বপ্নের মতো। যদিও জানেন এটি অস্থায়ী। বেসরকারি চাকরিজীবী শিহাব রহমান বলেন, ‘এই কয়েক দিন হয়তো নির্বিঘ্নে যাতায়াত করা যাবে। ছুটি শেষে পুরনো ঢাকা আবার ফিরবে। একদিকে ফাঁকা হয়ে যাওয়া ঢাকা উপভোগ করছেন অনেকে, অন্যদিকে দীর্ঘ যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া ও টিকিট সংকটের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বাড়ি ফেরাদের। তবে সব কষ্ট ছাপিয়ে ছুটির আনন্দে প্রিয়জনের কাছে ফিরতে পারাটাই তাদের কাছে বড় পাওয়া।