মৌসুমের শেষে এসে শুরু হয়েছে ইলিশ সংগ্রহের ধুম। কেউ করছেন অনুষ্ঠানের জন্য, কেউ করছেন সারা বছর খাওয়ার জন্য। আবার অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভে ইলিশ মজুদ করে ঢোকাচ্ছেন কোল্ডস্টোরেজে (হিমাগারে)। প্রতিবছর প্রজনন মৌসুমে সরকার ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
এবছরও অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ইলিশ শিকারে আসছে নিষেধাজ্ঞা। প্রজনন বাড়াতে সরকার প্রতিবছর ইলিশ ধরা বন্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কোস্টগার্ড পুলিশ ও মোবাইল কোর্ট কঠোর ভূমিকা পালন করবে।
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম হিসেবে আগামী ৩ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে নিষিদ্ধ হচ্ছে ইলিশ মাছ আহরণ, সংরক্ষণ ও বেচাকেনার সকল কার্যক্রম। সে হিসেবে প্রায় শেষ প্রান্তে ইলিশের চলতি মৌসুম। বড় জাতের ইলিশ মাছের দাম এক টাকাও কমেনি। যা নিয়ে শুধু সাধারণ ক্রেতারাই নন, অনেক খুচরা ব্যবসায়ীও ইলিশের চড়া দাম নিয়েও অসন্তুষ্ট।
এদিকে ভারতকে ট্রানজিট বানিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইলিশ পাচারের খবর প্রকাশ হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানি। এরপর আর এক কেজি ইলিশও কলকাতায় পাঠাননি দেশের রপ্তানিকারকরা। এর আগের ৩ দিনে বেনাপোল আর আখাউড়া হয়ে ভারতে গেছে প্রায় ৭০ হাজার কেজি ইলিশ। বেনাপোল ফিশ কোয়ারেন্টাইন বিভাগের কর্মকর্তা আকসাদুল ইসলাম জানান, ‘ গত রোববার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত বৈধভাবে এক কেজি ইলিশও সীমান্ত পার হয়নি।’ বেনাপোল স্থলবন্দরের এক কর্মকর্তা বলেন, রপ্তানির জন্য গত রোববার স্থলবন্দরে আসে ইলিশ বোঝাই দুটি ট্রাক। রহস্যজনক কারণে পরে সিদ্ধান্ত বদলে ফিরে যায় তারা।’ বেশি দামে কিনে কম দামে রপ্তানি তাই পাঠানো বন্ধ বলে দাবি করা হলেও খোঁজ নিয়ে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ভারত হয়ে তৃতীয় দেশে ইলিশ পাচারের খবর জানাজানি হওয়ার কারণেই বন্ধ হয়ে গেছে আমদানি-রপ্তানি। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের কলকাতায় মাছের আড়ত আর ফ্ল্যাট থাকার খবরেও শুরু হয়েছে তোলপাড়। দুই দেশের একাধিক ব্যবসায়ী নিশ্চিত করেছেন বিষয়টি। জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে বেশি দামে কিনে কম দামে ভারতে রপ্তানি করা হয়। সেখান থেকে গোপনে তৃতীয় দেশে পাচার করে কয়েকগুণ লাভ করে সিন্ডিকেট। ভারতে রপ্তানি হওয়া ইলিশ কলকাতাসহ দেশটির বাজারে বিক্রি হয় সামান্যই।
এদিকে আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ মাছ রপ্তানির জন্য দেশীয় ৩৭টি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই অনুমোদনের আওতায় মোট ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানি করা যাবে। রপ্তানির এই প্রক্রিয়া গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে চলবে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত। রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিকেজি ইলিশের সরকার নির্ধারিত দাম ১২ দশমিক ৫ ডলার (প্রতি ডলার ১২০ টাকা দরে বাংলাদেশের মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৫০০)। রপ্তানিকারকরা বলছেন, ভারতে রপ্তানি মূল্যের তুলনায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বেশি থাকায় জেলেরা ইলিশ বাইরে পাঠাতে চাইছেন না। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে এ বছর ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি করাটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশই ইলিশ। দেশের জিডিপিতে এটি প্রায় ১ শতাংশ অবদান রাখে। বাংলাদেশের জেলেরা বছরে ছয় লাখ টন ইলিশ ধরেন। এই মাছের বেশিরভাগই আসে সমুদ্র থেকে।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে ইলিশ উৎপাদনের হার আকর্ষণীয়। বিশেষ করে ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে প্রতি বছর ইলিশের উৎপাদন হয়েছে পাঁচ লাখ টনের বেশি।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৬৭ হাজার টন ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছর ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৭৯ হাজার মেট্রিক টন। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মডেল অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন ৫ লাখ ৩৮ হাজার থেকে ৫ লাখ ৪৫ হাজার টন হতে পারে।