নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ি সংসদীয় ৩শ’ আসনের মধ্যে কম বেশি ৫২ আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত তালিকার গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। সীমানা বিন্যাসে গাজীপুরে আসন সংখ্যা বেড়েছে। তেমনি বাগেরহাটের আসন ১টা কমানো হয়েছে।
সংসদীয় আসনের এই পরিবর্তনে বিভিন্ন জেলায় ক্ষোভ বাড়ছে। বিশেষ করে ফরিদপুর, বাগেরহাট, পাবনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিভিন্ন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করছে। মহাসড়ক অবরোধও করা হচ্ছে। এদিকে আসন বিন্যাসের প্রতিবাদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন অনড় অবস্থানে রয়েছে। তারা জানিয়েছে আন্দোলন করে সীমানা পুনর্বহাল করা যাবে না। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এ বিষয়ে বলেন, বিক্ষোভ-আন্দোলন করেও কোনো ‘লাভ হবে না’।
জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের এই চুড়ান্ত সীমানার তালিকা অনুযায়ি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হবে। আসন সীমানা পরিবর্তন করায় গাজীপুরে আনন্দ মিছিল হলেও অপর চার জেলায় বিক্ষোভ-আন্দোলন চলছে। ইসি মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, সীমানা নির্ধারণের কাজটি কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজটি শেষ করেছে।
প্রশাসনিক অখণ্ডতা, ভৌগলিক এলাকা, সর্বশেষ আদম শুমারির কথা আইনে বলা হয়েছে। আদম শুমারির প্রতিবেদন পরীক্ষা করে দেখেছি। কিছুটা অসামঞ্জস্য রয়েছে বিতর্ক রয়েছে। গত ১৬ জুনের হালনাগাদ ভোটার সংখ্যার ওপর ৬৪ জেলার ভোটার সংখ্যা, গড় সংখ্যা, মোট সংখ্যা পরীক্ষা করে ঠিক করা হয়েছে যে কোথায় খ্বু বেশি, কোথায় খ্বু কম। “সেটা বিবেচনায় নিয়ে খসড়াটা করি। সেই খসড়ার ওপর দাবি-আপত্তি এলে, শুনানি করে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। আদম শুমারির যাতে ফাঁক না থাকে, সেজন্য ভোটার সংখ্যাকেও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত গেজেটের চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ি ঢাকার নির্বাচনি এলাকায় ছয় আসনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ২, ৪, ৫, ৭, ১০ ও ১৪ আসন। ঢাকা-২ আসনের মধ্যে কেরাণীগঞ্জ উপজেলার তাড়ানগর, কালাতিয়া, হজরতপুর, রুহিতপুর, শাক্তা, কালিন্দি ও ভাস্তা ইউনিয়ন এবং সাভার উপজেলার আমীনবাজার, তেতুলঝড়া, ভার্কুতা ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ঢাকা-৪ আসনে দক্ষিণ সিটির ৪৭, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪ এবং ৫৮ থেকে ৬১ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ঢাকা-৫ আসনে দক্ষিণের ৪৮, ৪৯, ৫০, ৬২ থেকে ৭০ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ঢাকা-৭ আসনে ২৩ থেকে ৩৩ এবং ৩৫, ৩৬, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ঢাকা-১০ আসনে ১৪ থেকে ১৮ এবং ২২ ও ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ঢাকা-১৪ আসনে উত্তর সিটির ৭ থেকে ১২ নম্বর ওয়ার্ড এবং সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ও বনগাঁও ইউনিয়নকে রাখা হয়েছে। ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনের সাভার থানার বিরুলিয়া এবং বনগাঁও ইউনিয়নকে ঢাকা-২ (কেরাণীগঞ্জ) আসনের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। আপত্তি পর্যায়ে ভোটার সংখ্যা বিবেচনায় উপজেলাকে দুইটি আসনে বিভক্ত করা বা সম্ভব না হলে সম্পূর্ণ সাভার উপজেলাকে একটি আসনে রাখা দাবিও উঠে। চূড়ান্ত তালিকায় বিরুলিয়া ইউনিয়নকে সাভার আসনের সঙ্গে ফেরত রাখা হলেও বনগাঁওকে ঢাকা-১৪ আসনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে বাগেরহাটে আসন সংখ্যা ৪ টি থেকে কমিয়ে ৩টি করা হয়েছে। বর্তমানে বাগেরহাট-১ আসনের মধ্যে বাগেরহাট সদর, মোল্লাহাট ও চিতলমারী উপজেলা, বাগেরহাট-২-এর মধ্যে ফকিরহাট, রামপাল ও মোংলা উপজেলা এবং বাগেরহাট-৩-এর মধ্যে কচুয়া, মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলা রাখা হয়েছে। এর আগে বাগেরহাট-১, ২, ৩ ও ৪ হিসেবে চারটি আসন ছিল। গাজীপুর অঞ্চলে পাঁচটি আসন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ছয়টি করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আসনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা), নারায়ণগঞ্জ-৪ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা, এনায়েতপুর, বক্তাবলী, কাশিপুর, কুতুবপুর, গোগনগর ও আলিরটেক এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ নারায়ণগঞ্জ সিটির ১১ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং বন্দর উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মানিকগঞ্জ-২-এর মধ্যে সিঙ্গাইর, হরিরামপুর উপজেলা এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ও ভাড়াটিয়া ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত এবং মানিকগঞ্জ-৩-এর মধ্যে হাটিপাড়া ও ভাড়াটিয়া ইউনিয়ন ব্যতীত মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা এবং সাটুরিয়া উপজেলা রাখা হয়েছে।
অন্যান্য জেলার যেসব আসনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে, এরমধ্যে রয়েছে- পঞ্চগড়-১ ও ২, রংপুর-১ ও ৩, সিরাজগঞ্জ-১ ও ২, পাবনা-১ ও ২, সাতক্ষীরা-২, ৩ ও ৪, ফরিদপুর-২ ও ৪, শরিয়তপুর-২ ও ৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও ৩, কুমিল্লা-১, ২, ৬ ও ১০, নোয়াখালী-১, ২, ৪ ও ৫ এবং চট্টগ্রাম-৭ ও ৮।
এর আগে দ্বাদশ সংসদের ২৬১ আসনের সীমানা বহাল রেখে ৩৯টি আসনে ছোটখাটো পরিবর্তন আনা হয়। সংসদীয় এলাকার সীমানা নিয়ে দাবী-আপত্তি জানাতে গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছিল। গত ২৭ আগস্ট চারদিনে সংসদীয় আসনের পুনঃনির্ধারিত সীমানার বিষয়ে ১ হাজার ৮৯৩টি দাবি-আপত্তির শুনানি গ্রহণ করা হয়। ৩৩ জেলার ৮৪টি আসন সম্পর্কিত ১ হাজার ১৮৫টি আপত্তি এবং ৭০৮টি পরামর্শ বা সুপারিশ পক্ষে রাখা হয়েছে।
পাবনার দুটি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বহালের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ॥ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদে পাবনার বেড়া উপজেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। রোববার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক অবরোধ করায় শত শত যানবাহন আটকা পড়ে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ॥ এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের অসন্তোষ জানিয়ে জেলার বিজয়নগর উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন এলাকাবাসী। রোববার বেলা সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার চান্দুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ’এর ব্যানারে উপজেলার লোকজন ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেন।
ফরিদপুরে এক্সপ্রেসওয়েতে অবস্থান কর্মসূচি॥ এদিকে ফরিদপুরে সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ করতে গিয়ে ভাঙ্গা উপজেলাকে বিভক্ত করার প্রতিবাদে ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে অবস্থান কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ভাঙ্গা বিশ্বরোড মোড়ে এক্সপ্রেসওয়েতে এ কর্মসূচির আয়োজন করে ভাঙ্গা উপজেলা ও পৌর বিএনপি। এর আগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে বিশ্বরোড মোড়ে জড়ো হন।
বাগেরহাটে হরতাল॥ এদিরেক বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে একটি কমিয়ে জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন করে নির্বাচনী সীমানার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের প্রতিবাদ এবং চারটি আসন বহাল রাখার দাবিতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছে সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটি। সম্মেলন থেকে হরতাল, অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিলসহ সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। রোববার দুপুরে বাগেরহাট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটির নেতা-কর্মীরা। কর্মসূচি অনুযায়ী, ৯ উপজেলা ও তিন পৌরসভায় বিক্ষোভ; সোমবার দিনব্যাপী হরতাল, মঙ্গলবার বিক্ষোভ মিছিল এবং বুধ- বৃহস্পতিবার হরতাল কর্মসূচী দেয়া হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, বিক্ষোভ-আন্দোলন করেও কোনো ‘লাভ হবে না’। নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত সংসদীয় আসনের সীমানার চুড়ান্ত তালিকা নিয়ে আইন অনুযায়ী কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের কাছে ‘প্রশ্ন তোলার’ কোনো সুযোগ নেই।