ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশে চালা, ডাল,তেল পোঁয়াজসহ নিত্য প্রয়োজণীয় খাদ্য দ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ভারত থেকে আমদানি করা চাল এদেশে আসা সাময়িক বন্ধের খবর পেয়েই ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে এই অযুহাতে হুট করে চালের দাম ইচ্ছে মতো বাড়াতে থাকে। ফলে নিম্ম ও মধ্যবিত্ত্ব আয়ের লোকজনের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে চালসহ অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের দাম।
অথচ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় খাদ্যগুদামে পর্যাপ্ত চালের মজুত রয়েছে। কিন্তু চালের পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও অতিমোনাফা লোভী অসৎ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দেশের মানুষকে জিম্মি করে চালের দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
সূত্র মতে, অবশেষে দেশের এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বতীকালীন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সহযোগিতায় রাজধানীসহ সারাদেশে বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি সিন্ডিকেট ভাঙ্গতেই চাল আমদানির অনুমতির বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আর এই উদ্যোগের ফলে বাজারে চালের দাম হু হু করে বৃদ্ধির লাগামে টান পড়েছে। সরকার আমদানির অনুমতি দেওয়ায় টানা ৪ মাস পর ভারত থেকে চাল বাংলাদেশে আসছে। ভারত থেকে আমদানি করা কয়েক শত টন চাল দেশে আসছে এই খবরেই কমতে শুরু হয়েছে পাইকারী এবং খুচরা বাজারের চালের দাম।
আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানান, চালের দাম আরো কমবে। চাল আমদানিতে শুল্ক ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করায় ভারত থেকে আমদানি করা চাল আবার যশোরের ‘বেনাপোল স্থলবন্দর ও দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর’ দিয়ে চাল এই দেশে আসছে। ভারত থেকে আমদানি করা কয়েক শত টন চাল দেশে আসছে এই খবরেই কমতে শুরু হয়েছে পাইকারী এবং খুচরা বাজারের চালের দাম। চালের দাম আরো কমবে বলে জানান, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা।
এদিকে গত ২১ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) দিবাগত রাত ৯টা পর্যন্ত ভারতীয় ৯টি ট্রাকে মোট ৩১৫ মেট্রিক টন চাল বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করেছে। আরো অনেক বেশ কিছু চালবোঝাই ট্রাক ভারত থেকে বাংলাদেশে আসবে।
যশোরের বেনাপোলের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাজী মূসা করিম অ্যান্ড সন্স-এর স্বত্বাধিকারী আব্দুস সামাদ জানান, ‘গত ১৯ আগস্ট থেকে ভারতীয় ৯টি ট্রাকে বোঝাই ৩১৫ মেট্রিক টন মোটা চাল ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে অপেক্ষমাণ ছিল। ২১ আগস্ট সেগুলো বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করেছে। এছাড়া আরও চালবোঝাই ট্রাক বেনাপোল বন্দরে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রি জমা দিয়ে ছাড়করণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, ‘বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাদ্য মন্ত্রণালয় বেসরকারি পর্যায়ে আমদানির অনুমতি দিতে ব্যবসায়ীদের কাছে আবেদন আহ্বান করে। গত ২৩ জুলাই থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত আবেদন করার সময়সীমা ছিল। সেই সময় বেনাপোলের আমদানিকারকরা আবেদন করেন এবং অনেকে অনুমতিপত্র (আইপি) পাওয়ার পর এলসি খুলেছেন। সেই আমদানির আওতায় বৃহস্পতিবার চাল এসেছে। আগামী রবিবার থেকে আমদানি আরও বাড়বে বলে আশা করছি। এতে বাজারে চালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত কমে আসবে। ভালো মানের চিকন চাল ৬৭ থেকে ৭০ টাকা এবং স্বর্ণা জাতের চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে।’
বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শামসুর রহমান বলেন, ‘চার মাস পর বৃহস্পতিবার থেকে আবারও ভারতীয় চাল আমদানি শুরু হয়েছে। শুরুতেই ৯ ট্রাকে ৩১৫ মেট্রিক টন চাল এসেছে। আরও ট্রাক পেট্রাপোল বন্দরে অপেক্ষমাণ রয়েছে।’
বেনাপোল উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপ-সহকারী কর্মকর্তা শ্যামল কুমার নাথ জানান, ‘চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল সর্বশেষ চাল আমদানি হয়েছিল। এরপর বৃহস্পতিবার আবার চাল আমদানি শুরু হয়েছে। এদিন ৯টি ট্রাকে ৩১৫ মেট্রিক টন চাল এসেছে। আমদানিকৃত চালের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দ্রুত সনদ প্রদান করা হবে।’
সূত্র মতে, ভারত থেকে আমদানিকরা করা চাল দিনাজপুরের ‘হিলি স্থলবন্দর’ দিয়েও বাংলাদেশে এসেছে। এতে পাইকারি এবং খুচরা বাজারে কেজি প্রতি ২ থেকে ৪ টাকা কমেছে বিভিন্ন প্রকার চালের দাম।
প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে আসছে চাল। হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে স্বর্ণা, শম্পা কাটারি, রত্নাসহ মিনিকেট জাতের চাল আমদানি করা হচ্ছে। ৪ মাস বন্ধ থাকার পর চলতি মাসের ১২ আগস্ট থেকে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে চাল আমদানি শুরু হয়েছে। ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে কমতে শুরু করেছে চালের দাম।
বর্তমানে পাইকারি বাজারে শম্পা কাটারি জাতের চাল কেজি প্রতি ২ টাকা কমে ৬৮ টাকা, স্বর্ণা জাতের চাল কেজি প্রতি ২ টাকা কমে ৫৪ টাকায় এবং আটাশ জাতের চাল কেজি প্রতি ৪ টাকা কমে ৫৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে উনত্রিশ জাতের চাল আগের ৫৪ টাকা কেজি দরেই বিক্রি হচ্ছে। দাম কমায় সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরছে।
হিলি স্থলবন্দরের চাল আমদানিকারক নূর ইসলাম বলেন, দেশজুড়ে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ভারত থেকে ৪ মাস পর চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এসব চাল ভারতে বিভিন্ন স্থান থেকে আমদানি করা হচ্ছে। আমদানি অব্যাহত থাকলে চালের দাম আরও কমে আসবে।
হিলি কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা জামান বাঁধন বলেন, চাল নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য। আমদানি চাল দ্রুত খালাসপূর্বক সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। চলতি মাসের ১২ আগস্ট থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ভারতীয় ৩৪৪ ট্রাকে প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানি হয়েছে এ স্থলবন্দর দিয়ে।
আ. দৈ./কাশেম