রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সড়কে থামছে না মৃত্যুর মিছিল, বাড়ছে উদ্বেগ
শাহীন রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৮:১০ পিএম  আপডেট: ০৮.০৮.২০২৬ ৮:২২ পিএম  (ভিজিট : ১০৪)
X

দেশের সড়ক যেন ক্রমেই হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে আসছে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহত হওয়ার খবর। কখনো বাসের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষ, কখনো মোটরসাইকেল ও ভারী যানবাহনের সংঘাত, আবার কখনো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পথচারী বা সড়কের পাশে থাকা মানুষকে চাপা দেওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ শুক্রবার, ৭ আগস্ট সিলেট ও বগুড়ায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি বড় দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। সিলেটে দুই বাসের সংঘর্ষে ৯ জন এবং বগুড়ায় বাসচাপায় ৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সিলেটের ওসমানীনগরে দুই যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে বগুড়ায় বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে থাকা শ্রমিকদের চাপা দিলে প্রাণহানি ঘটে। শুক্রবারের এই মর্মান্তিক ঘটনাই শেষ নয়। 

শনিবার ৮ আগস্টও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর এসেছে। বাসসের প্রতিবেদনে ঠাকুরগাঁওয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এক বৃদ্ধ ও এক কিশোরের মৃত্যুর কথা জানা গেছে। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে দুজন নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। রাজধানীর ডেমরায় আগের দুর্ঘটনায় আহত এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ, সড়কে প্রাণহানির ধারাবাহিকতা থামছে না।

জুলাইয়েও চার শতাধিক মৃত্যু॥ সড়ক দুর্ঘটনার সামগ্রিক চিত্র আরও ভয়াবহ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত এবং ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে সড়কে। 

এর আগের মাস জুনেও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ওই মাসে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত ও ৫৬১ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, পথচারী, চালক ও পরিবহন শ্রমিকও ছিলেন। পরপর দুই মাসের এই পরিসংখ্যান বলছে, সড়কে প্রাণহানি কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক সমস্যা নয়; বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিয়েছে।


সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে মোটরসাইকেল আরোহীরা॥ সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ৮ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। 

এসব দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন। হিসাবটি আরও ভয়াবহভাবে দেখলে বোঝা যায়—এই সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাতজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ঈদযাত্রার সময়ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ১৩ দিনের যাত্রাকালে ২৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন নিহত হন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ১২৪ জন, যা মোট প্রাণহানির ৪৪ শতাংশের বেশি।

শুধু চালককে দায়ী করলেই সমাধান হবে না॥ সড়ক দুর্ঘটনার পর সাধারণত চালকের বেপরোয়া গতি, অসতর্কতা বা ভুলকে দায়ী করা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এর সঙ্গে চালকের দক্ষতা ও মানসিকতার পাশাপাশি যুক্ত রয়েছে যানবাহনের ফিটনেস, সড়কের নকশা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং পথচারীর নিরাপত্তা।

 গত কয়েক মাসের দুর্ঘটনার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেও একই ধরনের কারণ বারবার সামনে আসে—বেপরোয়া গতি, ভুল ওভারটেকিং, মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং সড়কের পাশে নিরাপদ জায়গার অভাব। উদাহরণ হিসেবে গত মে মাসে গোপালগঞ্জে বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিষিদ্ধ এলাকায় বেপরোয়া ওভারটেকিংকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল একটি বাঁকের কাছে, যেখানে যানবাহনের গতি কমিয়ে চলার কথা।

আঞ্চলিক সড়কেও বড় ঝুঁকি॥ সড়ক দুর্ঘটনা শুধু মহাসড়কেই সীমাবদ্ধ নয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের জুনের তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনার হার ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই মাসে মোট দুর্ঘটনার ৪১.১০ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে এবং প্রায় ৩২ শতাংশ মহাসড়কে ঘটেছে। অর্থাৎ, স্থানীয় ও আঞ্চলিক সড়কগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এসব সড়কে বাজার, বাসস্ট্যান্ড, স্কুল-কলেজ, পথচারী পারাপার এবং দ্রুতগতির যানবাহন একই জায়গায় চলাচল করায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

ঈদে বাড়ে দুর্ঘটনা, কিন্তু সংকট সারা বছরের॥ ঈদের সময় অতিরিক্ত যানবাহন ও যাত্রীর চাপের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোর তথ্য দেখাচ্ছে, শুধু ঈদকেন্দ্রিক ভিড়কে দায়ী করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২১ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ঈদুল আজহার যাত্রাকালে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন নিহত ও ১,২৯৪ জন আহত হয়েছেন। আগের ঈদের তুলনায় দুর্ঘটনা ৩.৯৫ শতাংশ এবং প্রাণহানি ৩.০৭ শতাংশ বেড়েছিল। অর্থাৎ, উৎসবের সময় ঝুঁকি বাড়লেও সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো সারা বছরই সক্রিয় থাকে।

করণীয় কী॥ বিশেষজ্ঞরা বলছেন সড়কে মৃত্যু কমাতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। প্রথমত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ব্যবস্থায় কঠোরতা আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান চালাতে হবে। তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে প্রকৌশলগত সংস্কার করতে হবে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে হেলমেট ব্যবহারের পাশাপাশি অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই জরুরি। একই সঙ্গে ভারী যানবাহনের চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানোর প্রবণতা বন্ধ করা দরকার।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্ঘটনার পর শুধু মামলা বা তদন্তে সীমাবদ্ধ না থেকে কেন দুর্ঘটনা ঘটল এবং ভবিষ্যতে একই জায়গায় বা একই ধরনের ঘটনায় কীভাবে প্রাণহানি ঠেকানো যাবে, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অনিবার্য দুর্যোগ নয়। যথাযথ আইন প্রয়োগ, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, দক্ষ চালক, ফিট যানবাহন এবং দায়িত্বশীল পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনের একের পর এক দুর্ঘটনা বলছে, ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এখনই। নইলে সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেেছন॥ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ নতুন করে খুঁজে বের করার চেয়ে বিদ্যমান আইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদারের মতে, দুর্ঘটনার কারণগুলো মোটামুটি জানা থাকলেও মূল ঘাটতি রয়েছে আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি ও পরিকল্পনায়। তাঁর মতে, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। 

অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দুর্ঘটনাকে শুধু চালকের ভুল হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া সম্ভব নয়। অনিরাপদ ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল আইন প্রয়োগ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দুর্বল সড়ক ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শুধু চালককে দায়ী না করে সড়ক, যানবাহন, চালক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা চারটি দিক একসঙ্গে পর্যালোচনা করা জরুরি।

আ.দৈ/আরএস




Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : [email protected]

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝