এবার আলোচনা কে হচ্ছেন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব
শাহীন রহমান

দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলামের নাম প্রায় চূড়ান্ত। তবে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দল ও সরকারের তিন জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। দলীয় মহাসচিব, সংসদ ও মন্ত্রী থেকে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দলের পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন। জানা গেছে বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে এখনি আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে দলীয় সুত্রে জানা গেছে কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বর্তমানে তিনি মন্ত্রী পদমর্যাদার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে কাউন্সিলে দলের মহাসচিব হিসেবে রিজভীর পাশাপাশি স্বরাষ্টমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদেও নামও আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টসুত্রে জানা গেছে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভীর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
দ্বিতীয়ত, বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে রিজভীর দীর্ঘদিনের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। দলের কঠিন সময়ে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা, নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, দলীয় কর্মসূচি ঘোষণা, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সারা দেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে তিনি তৃণমূল পর্যায়েও পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের সাংগঠনিক বাস্তবতা সম্পর্কে রিজভীর ধারণা অন্য অনেক নেতার তুলনায় বেশি।
তৃতীয়ত, বিএনপির অতীত সাংগঠনিক রীতিও রিজভীর পক্ষে যাচ্ছে। দলটির ইতিহাসে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবকে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করার নজির রয়েছে। সে কারণে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে প্রথম ধাপে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করে পরে জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করার সম্ভাবনার কথা দলীয় সূত্রগুলো বলছে।
অন্যদের নামও আলোচনায়॥ তবে মহাসচিবের দৌড় কেবল রিজভীকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং পানিসম্পদমন্ত্রী শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানির নামও বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দলীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা। সরকার গঠনের আগে মহাসচিব পদ নিয়ে আলোচনায় তাঁদের নামও জোরালোভাবে এসেছিল। কিন্তু বর্তমানে তাঁরা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় সাংগঠনিকভাবে পূর্ণ সময় দেয়ার ক্ষেত্রে রিজভীর তুলনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবেন এবং দল ও দেশের জন্য কার্যকর—এমন কাউকেই মহাসচিব করা হবে। তাঁর বক্তব্যে তুলনামূলক তরুণ ও কর্মীবান্ধব নেতৃত্বের সম্ভাবনার কথাও এসেছে। ফলে সিদ্ধান্তটি শুধু বর্তমান পদমর্যাদা বা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে হবে এমন নিশ্চয়তাও নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিএনপি এখন ক্ষমতাসীন দল। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত থাকবেন। এই বাস্তবতায় দলের দৈনন্দিন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ, দলীয় কর্মসূচি, নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় এবং রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যার বড় দায়িত্ব মহাসচিবের ওপর পড়বে। এ কারণে নতুন মহাসচিবের ভূমিকা আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু দলের চেয়ারম্যান হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত থাকবেন, তাই মহাসচিব দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন।
তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ নেই এমন কাউকে এই দায়িত্ব দিলে সাংগঠনিকভাবে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। এই জায়গাতেই রিজভীর সবচেয়ে বড় সুবিধা। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকায় দলের জেলা, উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে। বিএনপির আন্দোলনের সময়ও তিনি দলের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ ছিলেন। ফলে বিরোধী রাজনীতি থেকে ক্ষমতাসীন দলে রূপান্তরের এই সময়ে সংগঠনকে সক্রিয় রাখার জন্য তাঁকে উপযুক্ত মনে করছেন দলের একটি অংশ।
মির্জা ফখরুল দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে দলের সংকট, আন্দোলন, নির্বাচন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে তাঁর জায়গায় এমন একজনকে প্রয়োজন, যিনি দলের সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন। রিজভীর ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতার একটি বড় সুবিধা রয়েছে।
আরও পড়ুন
তিনি ফখরুলের মতো দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং দলের তৃণমূল কাঠামোর সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ রেখেছেন। ফলে নেতৃত্বে পরিবর্তন হলেও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের ছন্দপতন হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম থাকবে। এ ছাড়া রিজভী দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন। ছাত্ররাজনীতি থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থান। দলের দুঃসময়ে গ্রেপ্তার, মামলা এবং নানা চাপের মধ্যেও তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। এই রাজনৈতিক অতীতও তাঁর পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে কাজ করছে।
জানা গেছে সব আলোচনা, হিসাব-নিকাশ ও সম্ভাবনার পরও বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকেই আসবে। রিজভীর নাম এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকলেও দলীয় আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে ‘চূড়ান্ত মহাসচিব’ বলা যাবে না।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে শুধু একজন মহাসচিবের পরিবর্তন হবে না; বিএনপির ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক কাঠামোতেও একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় যত বেশি ব্যস্ত হবেন, দলের সাংগঠনিক ভার তত বেশি মহাসচিবের ওপর পড়বে। সেই পরীক্ষায় রিজভীকে বেছে নেওয়া হলে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সরকারের সঙ্গে দলের সমন্বয় বজায় রেখে একই সঙ্গে তৃণমূল সংগঠনকে সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ রাখা। আর সেই কারণেই রিজভীর সম্ভাব্য মহাসচিব হওয়া কেবল একটি পদ পরিবর্তন নয়; এটি বিএনপির ক্ষমতাসীন রাজনীতির নতুন সাংগঠনিক কাঠামোরও ইঙ্গিত বহন করছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে বা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলটি প্রাথমিকভাবে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলে বা তার আশপাশের সময়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন করেননি, তাঁকে মন্ত্রিসভায়ও রাখা হয়নি। তাই মহাসচিবের পদ শূন্য হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন দায়িত্বশীল নেতাদের কেউ কেউ।
আ.দৈ/আরএস





















