লিমন-বৃষ্টি হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটল, উঠে এল তদন্তকারীদের বর্ণনায়
নিজস্ব প্রতিবেদক

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার রোমহর্ষ বর্ণনা তুলে ধরেছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ। ২৭ বছর বয়সী এই দুই শিক্ষার্থীকে সবশেষ প্রায় দুই সপ্তাহ আগে দেখা গিয়েছিল। এক সপ্তাহ পর লিমনের মরদেহ পাওয়া যায়।
বৃষ্টিকেও হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা তদন্তকারীদের। এই হত্যার ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। শুনানির জন্য স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার তাকে আদালতে তোলার কথা ছিল। হত্যার অভিযোগ থাকাকালে আবুঘরবেহকে কারাবন্দী রাখতে আদালতের কাছে গত সপ্তাহে আবেদন করেছিলেন আইনজীবীরা।
এ ছাড়া ওই আবেদনে একটি বিস্তারিত সময়রেখাও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তদন্তকারীদের ধারণা অনুযায়ী কীভাবে লিমন ও বৃষ্টিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে, তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার সময় তাঁদের ও সন্দেহভাজন আসামির কর্মকাণ্ডের বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে।
গত শনিবার হিলসবরো কাউন্টি আদালতে আবেদনটি করেছিলেন সরকারি আইনজীবীরা। এতে বলা হয়েছে, ১৬ এপ্রিলেও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল লিমন ও বৃষ্টির। দুই শিক্ষার্থী নিজেদের মধ্যেও অল্প সময়ের জন্য ফোনালাপ করেছিলেন। তবে এর পরে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
আদালতে করা আবেদনে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে ১৬ এপ্রিল দিনের মাঝামাঝি সময়ে বৃষ্টিকে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) ক্যাম্পাসে হাঁটাচলা করতে দেখা যায়। সেদিন সন্ধ্যায় তার চশমা নেওয়ার জন্য এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। তবে বৃষ্টি যাননি। এমনকি ওই বন্ধু তাকে ফোন করলেও তিনি তা ধরেননি।
লিমনের মুঠোফোনের অবস্থান অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪৩ মিনিটের দিকে ফ্লোরিডার ক্লিয়ারওয়াটার এলাকায় গিয়েছিলেন তিনি। এর আগে তার আবাসস্থল ও ক্যাম্পাসের কাছাকাছি তার মুঠোফোনের অবস্থান দেখা যায়। লিমনের বসবাসের স্থান থেকে ক্লিয়ারওয়াটারের দূরত্ব মোটামুটি ৩২ মাইল।
আইনজীবীরা বলেছেন, লিমনের মুঠোফোনের অবস্থান ক্লিয়ারওয়াটারে দেখানোর ১০ মিনিটের মধ্যে ওই এলাকায় যেতে দেখা যায় আবুঘরবেহের সাদা রঙের হুন্দাই জেনেসিস জি-৮০ মডেলের গাড়িটিকে। মুঠোফোন ও গাড়ি চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, সে রাতে আবুঘরবেহ ও লিমনের মুঠোফোনের অবস্থানের মধ্যে মিল ছিল।
লিমন ও আবুঘরবেহের অন্য একজন রুমমেট দেখতে পান আবুঘরবেহ একটি চাকাওয়ালা ট্রলি ব্যবহার করে তার ঘর থেকে কিছু কার্ডবোর্ডের বাক্স অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ময়লা ফেলার স্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে সিভিএস নামে ওষুধ ও খুচরা পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে আবুঘরবেহের মুঠোফোন থেকে আবর্জনা রাখার ব্যাগ, ঘর পরিষ্কার করার লাইজল, দুর্গন্ধনাশক ফেব্রিজ ও অন্য কিছু পণ্যের অর্ডার করা হয়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর তাদের অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় পণ্যগুলো পৌঁছে দেয় সরবরাহ সেবা প্রতিষ্ঠান ডোরড্যাশ।
আদালতে করা আবেদন অনুযায়ী, লিমন ও আবুঘরবেহের অন্য একজন রুমমেট দেখতে পান, আবুঘরবেহ একটি চাকাওয়ালা ট্রলি ব্যবহার করে তাঁর ঘর থেকে কিছু কার্ডবোর্ডের বাক্স অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ময়লা ফেলার স্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানার হলফনামায় বলা হয়েছে, হিশাম আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটির কাছে একটি বিষয় জানতে চেয়েছিলেন, তা হলো ‘হিলসবরো রিভার স্টেট পার্কে কি গাড়িতে তল্লাশি করা হয়? ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে দুইবার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুতে গিয়েছিলেন তিনি।
এরই মধ্যে লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। এর পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বৃষ্টির কাজের জায়গায় তল্লাশি করে পুলিশ। সেখান থেকে তার খাবারের বাক্স, একটি ম্যাকবুক, আইপ্যাডসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়।
আদালতে করা আবেদন অনুযায়ী, হিশাম আবুঘরবেহের মায়ের সঙ্গে কথা বলেন তদন্তকারীরা। তিনি জানান, তার সঙ্গে সবশেষ ১৮ এপ্রিল আবুঘরবেহের দেখা হয়েছিল। মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ছেলে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না। এ ছাড়া অতীতে পরিবারের সঙ্গেও সহিংস আচরণ করেছিলেন তিনি।
২০২৩ সালে শারীরিক আঘাত বা লাঞ্ছনার অভিযোগে দুইবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আবুঘরবেহ। পরে অভিযোগগুলো তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবে ওই ঘটনাগুলোর একটির পর তাঁর ভাই একটি নিষেধাজ্ঞার জন্য আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনের পর আবুঘরবেহকে তার ভাইয়ের কাছে বা তার বাড়িতে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের মে মাসে সেই নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়।
আ.দৈ/আরএস




















