সীমান্তে সক্রিয় চোরকারবারিরা
নিষিদ্ধ ভারতীয় মদ প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে রাজধানীর বারে
ইসমাঈল হুসাইন ইমু

ভারতীয় মদ দেশে নিষিদ্ধ থাকলেও রাজধানীর বেশকিছু বারে মিলছে অবাধে। কোন রাখ ঢাক ছাড়াই বারে গেলেই পাওয়া যাচ্ছে ম্যাজিক মোমেন্ট, হুইস্কি, রয়েল স্টেক, সিগনেচার, ভ্যালেনটাইন, অফিসার চয়েসসহ বাহারি নামের মদ।
সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন বার ও রেস্টুরেন্টে এসব মদ অবাধে বিক্রি হচ্ছে। দেশিয় মদের (কেরু) চাহিদা বেশি থাকলে একটি অসাধু চক্র ভারতীয় এসব মদ বারে বিক্রি করে রাজস্ব বঞ্চিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) উদাসীনতাকে দায়ি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ডিএনসির কর্মকর্তাদের দাবি তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে মাঝে মধ্যে ধরাও পড়ছে কারবারিরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বেশকিছু মদের বারে ভারতীয় বিভিন্ন মদ বিক্রি হচ্ছে। বারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- পিকক, এরাম, রেড ড্রাগন, গোল্ডেন ড্রাগন, গ্যালাক্সি, রেডবাটন ও হোটেল পুর্বানী। এসব বার এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএনসির ইন্সপেক্টরদের ম্যানেজ করেই চলছে এ ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে-মাঝেমধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালানো হয়। তবে বার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে মাসোহারা পেয়েই বিদায় নেন অভিযান পরিচালনায় আসা ডিএনসির কর্মকর্তারা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কোনভাবেই ভারতীয় মদ বিক্রি করতে পারবে না বার কর্র্তৃপক্ষ। মদ বিক্রির লাইসেন্স ও আমাদানী নীতিমালার শর্ত ভঙ্গ হলে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তবে কোন কর্মকর্তার যোগসাজসে এরকম ঘটলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
যেসব রুট দিয়ে ঢুকছে ভারতীয় মদ : ভারতের ডাউকি সীমান্ত দিয়ে সিলেটের জাফলং, মেঘালয়ের পাদদেশে সারি নদী, সুনামগঞ্জের সীমান্ত পথ, ভারতের ত্রিপুরা থেকে মৌলভীবাজার সীমান্ত, আসাম পাড়া থেকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট সীমান্ত, বারতের ভোজাডাঙা থেকে সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্ত, দিনাজপুর ফুলবাড়ি সীমান্ত। এছাড়া ভারতের সবচেয়ে চোট রাজ্য ত্রিপুরা বাংলাদেশের তিন দিক থেকে ঘেরা এলাকাগুলোতে অবাধে মাদক আসছে। এসব এলাকা হলো- ফেনী, কুমিল্লা ও বি বাড়িয়া। আগরতলায় বেশকিছু মদের কারখানা রয়েছে সেখান থেকে মূলত আমাদের সীমান্ত দিয়ে চোরকারবারিরা ভারতীয় মদ, ফেনসিডিল ও গাঁজা নিয়ে আসছে। সম্প্রতি আগরতলার ওইসব কারখানার মদ পান করে বেশকজনের ম্যত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যা ভারতীয় গনমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার হয়েছে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার প্রধানপাড়া এলাকায় এ অভিযান চালায় বিজিবি। ওই অভিযানে জব্দ করা মদের আনুমানিক মূল্য ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা। বিজিবি জানায়, ঠাকুরগাঁও সেক্টরের অধীনস্থ নীলফামারী-৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বোদা থানার প্রধানপাড়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে ৫৬ বিজিবির মালকাডাঙ্গা বিওপির একটি বিশেষ টহল দল হাবিলদার শাহিনুল আলমের নেতৃত্বে অংশ নেয়। তারা সীমান্ত পিলার ৭৭৫/১০-এস/১২ থেকে প্রায় ১০০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অভিযান চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় ২৫ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করে। নীলফামারী-৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেনাল কর্নেল সিরাজুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ২০ মার্চ ভোরে ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন (৩৯ বিজিবি) ঝিনাইগাতী উপজেলার হালুয়াটি এলাকায় চোরাকারবারীরা অভিনব কৌশলে ভারতীয় মদ পাচারের চেষ্টা করছিল। এমন খবরের ভিত্তিতে ঝটিকা অভিযানে নামে বিজিবি। উদ্ধার করে ৪৪৬ বোতল ভারতীয় মদসহ একটি পিকআপ ভ্যান। জব্দকৃত মালামালের আনুমানিক সিজার মূল্য ৩১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর বারিধারায় একটি গাড়ি তল্লাশি করে ৫২ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। জড়িত থাকার অভিযোগে চালকসহ তিনকে গ্রেপ্তার করে। গাড়িতে থাকা দুই ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ সানোয়ার ও রিয়াজউদ্দিন। তারা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে পরিচয় দেন। পরে তাদের কাছ থেকে দুটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। দেখা যায়, রিয়াজউদ্দিন গত ৮ মাসে ৪০ বারের বেশি বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েকটি চক্র ভারত থেকে নিয়মিত মদ নিয়ে আসছে। আর তা বিক্রি করা হচ্ছে গুলশান, বনানী, বারিধারাসহ রাজধানীর অভিজাত এলাকার ক্রেতাদের কাছে। এতে সরকার শুল্ক হারাচ্ছে। চক্রগুলোর সঙ্গে ভারতীয় কিছু নাগরিক জড়িত। তারা মূলত মদ আনার কাজটি করেন। ডিএনসির এক কর্মকর্তার ভাষ্য, ২০ থেকে ২৫ জন ভারতীয় নাগরিক ট্রেনে করে নিয়মিত বাংলাদেশে আসেন। তারা মূলত লাগেজ পার্টির সদস্য। লাগেজে করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে আসেন। এর পাশাপাশি মদ নিয়ে আসেন। এসব লাগেজ ও মদ বাংলাদেশি চক্রের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দিয়ে তারা ভারতে ফিরে যান।
বাংলাদেশে মদ আমদানির শুল্কহার ৫৯৬ থেকে ৬১১ শতাংশ। অর্থাৎ এক লিটার মদের দাম যদি ১০০ টাকা হয়, তাহলে বাংলাদেশে শুল্কসহ দাম দাঁড়াবে ৭০০ টাকার বেশি। বিয়ারের শুল্কহার ৪৪৩ শতাংশ। অবশ্য কূটনীতিকদের জন্য বিনা শুল্কে মদ কেনার সুযোগ রয়েছে। এর জন্য রয়েছে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থা। কিন্তু শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মদ বাইরে বিক্রি হতো।
বছর দুয়েক আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কড়াকড়ির কারণে বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলোতে মদ আমদানি ও বিক্রির তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সফটওয়্যারে যুক্ত করতে হচ্ছে। এতে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কূটনীতিকদের জন্য আনা বিদেশি মদ বাইরে বিক্রির সুযোগ কমেছে। যাত্রী (অপর্যটক) ব্যাগেজ (আমদানি) বিধিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশে আসার সময় একজন বিদেশি নাগরিক এক লিটার পর্যন্ত মদ বা সমজাতীয় পানীয় শুল্ক ছাড়া নিয়ে আসতে পারেন। বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই। আর শুল্ক ছাড়া আনা মদ বাইরে বিক্রি করা নিষিদ্ধ।
আ.দৈ/আরএস





















