পুুলিশের নতুন হারুন ডিসি মাসুদ
ইসমাঈল হুসাইন ইমু

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শাসনামলে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনায় ছিলেন তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর সময় হারুনসহ অনেক কর্মকর্তাই গা ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ পালিয়েছেন পার্শ্ববর্তী দেশে। তাদের মধ্যে দুএকজন সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে মাঝে মধ্যে উঁিক দিচ্ছেন। এই হারুনের মত অন্তবর্তী সরকারের সময় নানা আলোচনায় আসেন রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ আলম।
শিক্ষার্থীসহ নানা আন্দোলন দমাতে তার অগ্রনী ভুমিকা ছিল। তবে বেশকিছু কাজে সমালোচনাও রযেছে তার বিরুদ্ধে। এই অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা গত সোমবার রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমে লঙ্কাকান্ড ঘটিয়েছেন। মাদক বিক্রেতাতো পাননি উল্টো উদ্যানে আড্ডা দিতে যাওয়া নিরীহ যুবকদের বেধড়ক পিটিয়েছেন তিনি। শুধু সাধারণ নাগরিক নয় সাংবাদিকদের মারধর করতে দিধা করেননি এই মাসুদ।
আইডি কার্ড দেখালেও কাজ হয়নি। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর আরো তেড়ে ওঠেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। বিভিন্ন মহলে তার অপসারন দাবি জোরালো হয়ে উঠছে। অনেকেই বলছেন ফ্যাসিস্ট হারুনের মতই অবস্থা হতে পারে মাসুদের। এদিকে রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে শাহবাগ থানা ঘেরাও করেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টার পর থেকে ঢাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ কর্মসূচি পালন করেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, সোমবার রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী নাইমুদ্দীনের ওপর অন্যায়ভাবে কোনো ধরনের অপরাধ ছাড়া পুলিশ হামলা করে। রাস্তা-ঘাটে যে কাউকে বিনা কারণে মারার অধিকার পুলিশকে কে দিয়েছে? মানুষ কি এখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে পারবে না? রাস্তা কি পুলিশের সম্পত্তি? ডিসি মাসুদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, না হলে আমরা সরব না।
তাদের দাবিগুলো হলো- ডিসি মাসুদসহ হামলায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক পুলিশের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে; ক্যাম্পাস এরিয়ার ভেতরে ও বাইরে সব প্রকার অযাচিত পুলিশিং বন্ধ করতে হবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা ‘হারুন গেছে যে পথে, মাসুদ যাবে সে পথে’, ‘আমার ভাইকে মারল কেন, প্রশাসন চাই’, ‘শাহবাগ থানা জবাব চাই, আমার ভাইকে মারল কেন’, ‘মাসুদের গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে’-সহ নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়।

বিক্ষোভে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কাফিরা জাহান বলেন, পুলিশসহ যেকোন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশ্ন করতে পারা নাগরিক অধিকার। অনেক লম্বা সময় ধরে আমাদের এ নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। গতকাল নাইমের ওপর হামলা পুলিশের সব সময় করা ইগোভিত্তিক ভায়োলেন্সের অংশ। তিনি বলেন, গতকাল নাইম উদ্দানে হাটছিল, ওরে প্রশ্ন করা হয়ছে। নাইম দেখাইছে ওর কাছে কিছু নাই। নাইম কেন প্রশ্ন করছে পুলিশের কাছে, এজন্য ওরে মারা হয়েছে।
এটা কোন জায়গার ন্যায়? এর জবাবদিহিতা কে করবে? আমরা কোনও জবাবদিহিতা চাই না। আমরা ডিসি মাসুদ ও তার বাহিনীর বিচার চাই। সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা ক্ষমতায় এসে এখন রাষ্ট্র সরস্কারে নামেন। আমাদের মারার জন্য পুলিশ নামালে; তার ফল কী হতে পারে- তা আপনাদের জানার কথা।
থিয়েটার বিভাগের শিক্ষার্থী আশরাফুল আলম অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন করার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো উঠে পড়ে লেগেছে। পুলিশ যখন এ ধরনের নিপীড়নমূলক কর্মকান্ড করে, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ফেসবুকে ঠিক-বেঠিক লিখছে। কিন্তু আপনাদের মনে রাখতে হবে, আজকে এটা আমার সাথে ঘটছে। কালকে এটা আপনাদের সাথে হবে।
এছাড়া এদিন বেলা ১২টায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ বিক্ষোভ করেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। এ সময় তারা পুলিশের হামলার প্রতিবাদ ও তাদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। সোমবার রাতে পুলিশের মাধকবিরোধী অভিযানে দুই সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিনসহ কয়েকজন দর্শনার্থী পুলিশের মারধরের শিকার হন। ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা হলেন- বাংলানিউজ২৪.কম-এর তোফায়েল আহমেদ এবং আজকের পত্রিকার কাউসার আহমেদ রিপন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, একদল পুলিশ সদস্য তোফায়েলকে লাঠি দিয়ে নির্বিচারে পেটাচ্ছেন। পরে অন্য পুলিশ সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
আরও পড়ুন
নাঈম উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘বহু ভাষার সন্ধ্যা’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছিলাম এবং ফেরার পথে পুলিশ আমাদের মুখোমুখি হয়। পরে তারা আমাদের কাছে অবৈধ কিছু না পেয়ে অভিযোগ তোলেন যে, আমরা নাকি তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছি। আমার মাথা, হাত ও পায়ে চোট লেগেছে। আমার সঙ্গে থাকা আরও এক বন্ধুকেও তারা মেরেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরাও অনেকবার হেনস্তার শিকার হয়েছেন অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নয় এবং এর দায়ভার শুধুমাত্র এই পুলিশ প্রশাসনের নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও নিতে হবে। কারণ এই প্রশাসনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যে নিরাপত্তা, সেটা নিশ্চিত করতে তারা ব্যর্থ।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের (ডিসি) দায়িত পান সাইবার ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের ডিসি মাসুদ আলম। মাসুদ আলম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি র্যাব-৬ এর ঝিনাইদহ ক্যাম্প, পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর বদলি করে তাকে পরবর্তীতে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ সুপার করা হয়।
আ.দৈ/আরএস





















