দু’বছরের আগে বাড়ানো যাবে না বাড়িভাড়া
নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রতি বছরের শুরুতেই রাজধানী ঢাকায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধি যেন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। জানুয়ারি এলেই অনেক বাড়িওয়ালা নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন। অথচ এতদিন বাড়িভাড়া নির্ধারণে সরকারের কোনো কার্যকর ও সমন্বিত নীতিমালা না থাকায় বাড়িওয়ালারা নিজেদের মতো করেই ভাড়া নির্ধারণ ও বৃদ্ধি করে আসছিলেন। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভাড়াটিয়ারা।
এই প্রেক্ষাপটে ভাড়াটিয়াদের স্বস্তি দিতে এবং বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। আগামী দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না—এমন নির্দেশনা দিয়েছে সংস্থাটি।
নির্দেশিকায় বলা হয়—
১. বাড়ির মালিককে অবশ্যই তার বাড়িটি বসবাসের উপযোগী অবস্থায় রাখতে হবে।
২. বাড়িতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবিচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দৈনিক গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহসহ অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা বাড়িওয়ালার দায়িত্ব। এসব সেবায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালাকে অবহিত করবেন এবং বাড়িওয়ালাকে দ্রুত সেই সমস্যা সমাধান করতে হবে।
৩. বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং সামনের উন্মুক্ত স্থানে সবুজায়ন (ফুল, ফল ও সবজি গাছ) করবেন।
৪. অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়িওয়ালাকে শর্তসাপেক্ষে প্রতিটি ভাড়াটিয়াকে ছাদের চাবি ও মূল গেইটের চাবি প্রদান করতে হবে।
৫. ভাড়াটিয়াকে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে হবে। বাড়িওয়ালাকে অবশ্যই প্রতিমাসে লিখিত ও স্বাক্ষরযুক্ত ভাড়ার রশিদ প্রদান করতে হবে এবং ভাড়াটিয়াকে সেই রশিদ সংগ্রহ করতে হবে।
৬. ভাড়াটিয়ার বাড়িতে যেকোনো সময় প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকবে। বাড়ির নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাড়িওয়ালাকে ভাড়াটিয়াকে অবহিত করতে হবে এবং তার মতামত গ্রহণ করতে হবে।
৭. নির্ধারিত মানসম্মত ভাড়া কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী দুই বছর পর্যন্ত বহাল থাকবে। ভাড়া বৃদ্ধির সময় হবে কেবল জুন-জুলাই মাসে।
৮. দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না। দুই বছর পর পারস্পরিক আলোচনা ও সম্মতির ভিত্তিতে ভাড়ার পরিবর্তন করা যাবে।
৯. নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়াটিয়া ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে প্রথমে মৌখিক সতর্কতা দিতে হবে। এরপরও ভাড়া পরিশোধ না হলে সব বকেয়া পরিশোধ সাপেক্ষে দুই মাসের লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল ও উচ্ছেদ করা যাবে।
১০. আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে ভাড়া চুক্তি বাতিল করতে চাইলে উভয় পক্ষকেই দুই মাসের নোটিশ দিতে হবে।
১১. বার্ষিক বাড়িভাড়া সংশ্লিষ্ট এলাকার বাজারমূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হতে পারবে না।
১২. বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে লিখিত চুক্তিপত্রে ভাড়ার পরিমাণ, ভাড়া বৃদ্ধির শর্ত, অগ্রিম জমা, বাড়ি ছাড়ার সময়সীমা ও অন্যান্য শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
১৩. বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় এক থেকে সর্বোচ্চ তিন মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না।
১৪. সিটি করপোরেশন এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি ও ভাড়াটিয়া সমিতি গঠন করতে হবে, যারা স্থানীয় পর্যায়ে ভাড়াবিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখবে।
১৫. যেকোনো সমস্যা প্রথমে ওয়ার্ড বা জোনভিত্তিক সমিতির মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। সমাধান না হলে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
১৬. ভাড়াটিয়ার অধিকার নিশ্চিতে এই নির্দেশিকা সম্পর্কে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের সচেতন করতে নিয়মিত সভা, মতবিনিময় ও আলোচনা আয়োজন করবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।
এই নির্দেশিকাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকায় বাড়িভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও হয়রানি কমবে বলে আশা করছে ডিএনসিসি। একই সঙ্গে ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার মধ্যে একটি ন্যায্য, মানবিক ও আইনসম্মত সম্পর্ক গড়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা নগর কর্তৃপক্ষের।
আ.দৈ/আরএস





















